BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
সংবাদ শিরোনাম
Home / দারসুল কুরআন / মু’মিনের বৈশিষ্ট্য (দারসূল কোরআন-৩)
ramadan_by_davinici-d27yj9t

মু’মিনের বৈশিষ্ট্য (দারসূল কোরআন-৩)

সূরা আল মু’মিনূন
আয়াত ১-১১
اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ .
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْم .
১। আয়াত
(১)قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ ০ (২) اَلَّذِيْنَ هُمْ فِىْ صَلاَتِهِمْ خشِعُوْنَ০ (৩) وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ ০  (৪)والَّذِيْنَ هُمْ لِلزَّكوةِ فَاعِلُوْنَ ০  (৫)وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ ০ (৬) اِلاَّ عَلى اَزْوَاجِهِِمْ اَوْ مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُمْ فَاِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ ০ (৭) فَمَنِ ابْتَغى وَرَاءَ ذلِكَ فَاُولئِكَ هُمُ الْعَادُوْنَ ০ (৮) وَالَّذِيْنَ هُمْ لاَمنتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُوْنَ ০ (৯) وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلى صَلَواتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ ০ (১০) اُولئِكَ هُمُ الْوَارِثُوْنَ ০ (১১) اَلَّذِيْنَ يَرِثُوْنَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ ০
২। ভাবানুবাদ
১. নিশ্চয়ই সফলতা লাভ করেছে মুমিনগণ, ২. যারা তাদের ছালাতে খুশু অবলম্বন করে, ৩. যারা বেহুদা কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকে, ৪. যারা পরিশুদ্ধি সাধনের কাজে তৎপর থাকে, ৫. যারা তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযাত করে, ৬.নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন মহিলাদের নিকটে ছাড়া, এদের কাছে গেলে তারা তিরস্কৃত হবেনা, ৭. তবে এদের বাইরে আরো কিছু চাইলে তারা হবে সীমালংঘনকারী, ৮. যারা আমানাত ও ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি রক্ষা করে, ৯. যারা তাদের ছালাতগুলোর হিফাযাত করে। ১০. এরা উত্তরাধিকারী, ১১. এরা উত্তরাধিকার রূপে পাবে আলফিরদাউস, যেখানে তারা থাকবে চিরদিন।
৩। পরিপ্রেক্ষিত
নবুওয়াত লাভের পর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তেরোটি বছর মাক্কায় অবস্থান করে ইসলামী দা‘ওয়াতের কাজ পরিচালনা করেন। এই তেরোটি বছরকে ইসলামী দা‘ওয়াত বা ইসলামী আন্দোলনের মাক্কী যুগ বলা হয়। মাক্কী যুগের মাঝামাঝি কোন এক সময় নাযিল হয় সূরা আলমু’মিনূন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই সূরাটি নাযিলের সময় তিনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিকট উপস্থিত ছিলেন।
সূরাটি নাযিল হওয়ার পর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘আমার ওপর এমন দশটি আয়াত নাযিল হয়েছে, কেউ যদি সেইগুলোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে, অবশ্যই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
এই কথা বলে তিনি এই সূরার প্রারম্ভিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করেন।
এই সূরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন সফলকাম মুমিনদের কতগুলো বৈশিষ্ট বর্ণনা করেছেন।
এই সূরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মানব সত্তা এবং পৃথিবী ও আসমানে বিরাজমান অগণিত নিদর্শন যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপস্থাপিত বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে সেই দিকে ইসলাম প্রত্যাখ্যানকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এই সূরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ইসলাম-বিদ্বেষীদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে যুগে যুগে আবির্ভূত নবী-রাসূলগণ একই দীনের অনুসারী ছিলেন। অতীতে বহু মানবগোষ্ঠী নবী-রাসূলদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই সূরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন যে অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া, বহু সংখ্যক সন্তান-সন্ততি থাকা কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়। আবার, অর্থ-সম্পদ কম থাকা, সন্তান-সন্ততি কম থাকা কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি কম থাকার অর্থ এই নয় যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ব্যক্তি হওয়ার পথ হচ্ছে ঈমানদার হওয়া, আল্লাহকে ভয় করে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিহার করে চলা এবং তাঁর নির্দেশগুলো একনিষ্ঠভাবে পালন করতে থাকা।
 এই সূরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ইসলাম-বিদ্বেষীদের মন্দ আচরণের মুকাবিলায় ভালো আচরণ করার জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকিদ করেছেন এবং শাইতান যেনো তাঁকে কখনো আবেগ-তাড়িত করে মন্দের জওয়াবে মন্দ অবলম্বন করতে প্ররোচিত করতে না পারে, সেই মর্মে তাঁকে সতর্ক করেছেন।
এই সূরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ইসলাম-বিদ্বেষীদেরকে আখিরাতের জওয়াবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভয় প্রদর্শন করেছেন।
৪। ব্যাখ্যা
প্রথম আয়াত
قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ ০
‘নিশ্চয়ই সফলতা লাভ করেছে মুমিনগণ।’
এই আয়াতে উল্লেখিত ‘আফলাহা’ শব্দটি ‘ফালাহ’ শব্দ থেকে উৎসারিত। ‘ফালাহ’ শব্দের অর্থ সাফল্য, সফলতা, কল্যাণ।
সাধারণত পৃথিবীর মানুষ অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া, অনেক
সন্তান-সন্ততি থাকা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে অন্যদের চেয়ে অগ্রবর্তী থাকাকে সফলতা বলে মনে করে। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন এই ভুল ধারণা অপনোদনের জন্য অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, সফলতার প্রাথমিক পুঁজি হচ্ছে ঈমান। যেইসব ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল, তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর নাযিলকৃত কিতাব এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করেন, সেইসব ব্যক্তি সফলতার সিঁড়ির প্রথম ধাপ অতিক্রম করতে সক্ষম হন।
দ্বিতীয় আয়াত
اَلَّذِيْنَ هُمْ فِىْ صَلاَتِهِمْ خشِعُوْنَ ০
‘যারা তাদের ছালাতে ‘খুশু’ অবলম্বন করে’।
এই আয়াতে সফলতা লাভকারী মুমিনদের একটি গুণ বা বৈশিষ্ট তুলে ধরা হয়েছে।
সফলকাম মুমিনগণ ছালাত আদায়কারী হয়ে থাকেন। আর ছালাতে তাঁরা খুশু অবলম্বন করেন।
খুশু শব্দের অর্থ বিনম্রতা।
সফলকাম মুমিনগণ তাড়াহুড়ো করে ছালাত আদায় করেন না। তাঁরা উদ্ধতভাবে ছালাত আদায় করেন না। তাঁরা ছালাত আদায়কালে এই দিক ওই দিক তাকান না। তাঁরা নিবিষ্ট মনে ছালাত আদায় করেন। তাঁরা সুস্থিরভাবে ছালাত আদায় করেন। তাঁরা বিনম্র-বিনীতভাবে ছালাত আদায় করেন। তাঁদের ছালাত বলে দেয়, তাঁরা তাঁদের রবের সামনে দাঁড়িয়েছেনÑ এই অনুভূতি নিয়ে ছালাত আদায় করছেন। তাঁদের ছালাতে দেহের সাথে মন সংগ দেয়।
তৃতীয় আয়াত
وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ ০
‘এবং যারা বেহুদা কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকে।’
এই আয়াতে সফলকাম মুমিনদের দ্বিতীয় গুণ বা বৈশিষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে।
‘লাগ্উন’ অর্থ বেহুদা কথা ও বেহুদা কাজ। সফলকাম মুমিনগণ কখনো কোন অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন না। অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয় কোন কাজ করেন না।
তাঁরা বাজে কথায় কান দেন না।
বাজে কাজের দিকে দৃষ্টি দেন না।
কোথাও কোন বাজে কাজ হতে দেখলে তাঁরা সেই স্থান এড়িয়ে চলেন।
এই সম্পর্কে সূরা আলফুরকানের ৭২ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
وَاِذَا مَرُّوْا بِاللَّغْوِ مَرُّوْا كِرَامًا ০
‘পথ চলাকালে কোথাও কোন বাজে কথা  বা বাজে কাজ হতে দেখলে, তারা ভদ্রভাবে সেই স্থান অতিক্রম করে চলে যায়।’
একজন খাঁটি মুমিন দুনিয়ার জীবনটাকে পরীক্ষার হলে অবস্থানকাল বলে মনে করেন। ফলে খেল-তামাশায় সময় কাটানো নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ঘণ্টাকে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করে তিনি আখিরাতের সফলতা নিশ্চিত করতে চান।
চতুর্থ আয়াত
وَالَّذِيْنَ هُمْ لِلزَّكوةِ فَاعِلُوْنَ ০
‘এবং যারা পরিশুদ্ধি সাধনের কাজে তৎপর থাকে।’
এই আয়াতে সফলকাম মুমিনদের তৃতীয় গুণ বা বৈশিষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে।
‘আয্যাকাত’ শব্দটির প্রধান অর্থÑ পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা, পরিশুদ্ধি, প্রবৃদ্ধি।
يُوْتُوْنَ الزَّكوةَ ০
কথাটির অর্থ হয় ‘তারা অর্থ-সম্পদ পরিশুদ্ধ করার লক্ষ্যে এর একটি অংশ বাইতুল মালে জমা দেয়।’
কিন্তু যখন বলা হয়Ñ
لِلزَّكوةِ فَاعِلُوْنَ ০
তখন এর অর্থ আর্থিক যাকাত দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এর অর্থ হয় চিন্তার পরিশুদ্ধি, চরিত্রের পরিশুদ্ধি এবং সমাজ ও সভ্যতার পরিশুদ্ধি।
অর্থাৎ সফলকাম মুমিনগণ কেবল নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও আমল-আখলাক পরিশুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হন না, তাঁরা গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে নিতে চেষ্টারত থাকেন।
সূরা আলআ‘লা-র ১৪ নাম্বার আয়াতেরÑ ০ قَدْ اَفْلَحَ مَنْ تَزَكّى
(সফলকাম হয়েছে সেই ব্যক্তি যেই ব্যক্তি পরিশুদ্ধি লাভ করেছে।) এবং
সূরা আশ্ শামস-এর ৯ নাম্বার আয়াতেরÑ
قَدْ اَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا ০
(সফলকাম হয়েছে সেই ব্যক্তি যেই ব্যক্তি আপন সত্তাকে পরিশুদ্ধ করে নিয়েছে।) বক্তব্য দ্বারা আত্মশুদ্ধির কথা বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সূরা আল’মুমিনূনের আলোচ্য আয়াতটিতে (অর্থাৎ চতুর্থ আয়াতে) যুগপৎ আত্মশুদ্ধি ও সমাজশুদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
আর পরিশুদ্ধি তৎপরতায় আত্মনিবেদিত থাকাকেই সফলকাম মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চম আয়াত
وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ ০
‘যারা তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযাত করে।’
এই আয়াতে সফলকাম মুমিনদের চতুর্থ গুণ বা বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে।
সফলকাম মুমিনগণ যৌন পবিত্রতা সংরক্ষণ করেন। তাঁরা উলংগ হওয়া থেকে বেঁচে থাকেন। তাঁরা অন্যদের সামনে নিজেদের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করেন না। তদুপরি তাঁরা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন কর্তৃক নিষিদ্ধ ক্ষেত্রে তাঁদের যৌন শক্তি ব্যবহার করেন না। তাঁরা উচ্ছৃংখল যৌন জীবন যাপন করেন না।
লজ্জাস্থানের হিফাযাতের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
مَنْ يَّضْمَنُ لِىْ مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنُ لَه الْجَنَّةَ –
[সাহ্ল ইবনু সা‘দ (রা), সহীহ আল বুখারী] ‘যেই ব্যক্তি তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হিফাযাতের জামিন হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হবো।’
ষষ্ঠ ও সপ্তম আয়াত
اِلاَّ عَلى اَزْوَاجِهِِمْ اَوْ مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُمْ فَاِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ ০
فَمَنِ ابْتَغى وَرَاءَ ذلِكَ فَاُولئِكَ هُمُ الْعَادُوْنَ ০
‘নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন মহিলাদের ছাড়া, এদের কাছে গেলে তারা তিরস্কৃত হবে না। তবে এদের বাইরে আর কিছু চাইলে তারা হবে সীমালংঘনকারী।’
اَلَّذٍيْنَ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ ০
আয়াত দ্বারা কেউ যেনো এই অর্থ গ্রহণ করতে না পারে যে, যৌন শক্তি আসলেই খারাপ জিনিস, অতএব আল্লাহ ওয়ালা লোকদের কর্তব্য যৌন চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকা, সেই জন্য এই দুইটি আয়াতে বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বৈধ স্থানে যৌন শক্তিকে ব্যবহার করা কোন নিন্দনীয় কাজ নয়। আপন স্ত্রী এবং আপন দাসী হচ্ছে সেই বৈধ স্থান। এর বাইরে অন্য কোথাও যৌন শক্তিকে ব্যবহার করা বৈধ নয়।
উল্লেখ্য যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবির্ভাব কালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আরব দেশেও উট, ঘোড়া, গরু, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদির মতো মানুষ বেচাকেনার হাট বসতো। এই সব হাটে বেচাকেনার মাধ্যমে মানুষ এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির মালিকানায় যেতো। এই মানুষগুলোকে ক্রীত দাস ও ক্রীত দাসী বলা হতো। মাক্কী যুগে যাঁরা মুসলিম হতেন তাঁদের কারো কারো মালিকানায় এই ধরনের দাস-দাসী থাকতো। ইসলাম মুনীবকে তাঁর মালিকানাধীন দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার প্রদান করে।
মাদানী যুগে যুদ্ধের ময়দানে বন্দী ব্যক্তিদের মধ্যে যাদেরকে বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে কিংবা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়া হতো না, তাদেরকে হত্যা না করে কিংবা সারা জীবনের জন্য কারাবন্দী না করে সরকার কর্তৃক মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো। ইসলাম মুনীবকে স্বীয় মালিকানাধীন যুদ্ধবন্দিনীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার প্রদান করে।
হঠাৎ করে সকল দাস-দাসীকে মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা এলে তাদের, বিশেষ করে দাসীদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও নিরাপত্তার বড়ো রকমের সমস্যা দেখা দিতো। সেই জন্য জ্ঞানময় বিজ্ঞতাময় সত্তা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন দাস-দাসীদের মুক্তির জন্য বিজ্ঞতাপূর্ণ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেন।
অতপর কোন আযাদ ব্যক্তিকে দাস বা দাসী বানানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হয়। দাস-দাসীদেরকে মুনীবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে অন্যত্র কাজ করে অর্থ যোগাড় করে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। কোন কোন অনভিপ্রেত কাজের কাফফারা স্বরূপ দাস মুক্তির বিধান দেওয়া হয়। সাধারণভাবে দাস-দাসীদেরকে মুক্ত করে দেওয়ার কাজকে অতীব পুণ্যের কাজ বলে চিহ্নিত করা হয়।
তদুপরি মুনীবের ঔরসে তাঁর মালিকানাধীন দাসীর গর্ভে সন্তান জন্ম নিলে তাকে ‘উম্মুল ওয়ালাদ’ বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং এরপর তাকে অন্যত্র বিক্রয় করা নিষিদ্ধ হয়।
মুনীব মৃত্যু বরণ করলে উম্মুল ওয়ালাদ সাথে সাথে আযাদ হয়ে যাবে বলে বিধান দেওয়া হয়।
উম্মুল ওয়ালাদের গর্ভজাত সন্তানগণ মুনীবের স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানদের মতোই যাবতীয় অধিকার পাবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।
অষ্টম আয়াত
وَالَّذِيْنَ هُمْ لاَمنتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُوْنَ ০
‘যারা আমানাত ও ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি রক্ষা করে।’
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন সফলকাম মুমিনদের পঞ্চম ও ষষ্ঠ গুণ বা বৈশিষ্ট তুলে ধরেছেন।
সূরা আলআহযাবের ৭২ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
اِنَّا عَرَضْنَا الاَمَانَةَ عَلَى السَّموتِ وَالاَرْضِ وَالْجِبَالِ فَاَبَيْنَ اَنْ يَحْمِلْنَهَا وَاَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الاِنْسَانُ ط اِنَّهُ كَانَ ظَلُوْمًا جَهُوْلاً০
‘আমি এই আমানাত (খিলাফাত) আসমানসমূহ, পৃথিবী এবং পাহাড়-পর্বতের সামনে পেশ করলাম। তারা তা বহন করতে প্রস্তুত হলো না, বরং তারা ভয় পেয়ে গেলো। কিন্তু মানুষ তা নিজের কাঁধে তুলে নিলো। অতপর মানুষ যালিম ও মূর্খের মতো কাজ করলো।’
সূরা আন্ নিসা-র ৫৮ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
اِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ اَنْ تُؤَدُّوا الاَمَانَاتِ اِلى اَهْلِهَا ط
‘অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে যাবতীয় আমানাত হকদারের নিকট সুপর্দ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।’
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
اَلْمَجَالِسُ بِالأَمَانَةِ اِلًّا ثَلَاثَةُ مَجَالِسَ سَفْكُ دَمٍ حَرَامٍ أَوْ فَرْجٍ حَرَامٍ أَوْ اِقْتِطاَعُ ماَلٍ بِغَيْرِ حَقٍّ ০
[জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রা), সুনান আবী দাউদ, মুসনাদে আহমাদ, সুনান আল বাইহাকী।] ‘মাজলিসের প্রসিডিংস আমানাত। তিনটি মাজলিস ছাড়া। সেইগুলো হচ্ছে : অন্যায়ভাবে রক্তপাত ঘটানো, ব্যভিচার সংঘটন অথবা অবৈধভাবে কারো অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত মাজলিস।’
  আমানাত শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মানুষকে যেই সব শক্তি-সামর্থ্য দিয়েছেন সেইগুলো আমানাত। তিনি মানুষকে যেইসব অর্থ-সম্পদ দিয়ে থাকেন সেইগুলো আমানাত। তিনি মানুষকে যেইসব নির্দেশ দিয়েছেন সেইগুলো আমানাত। কোন দল বা ভূ-খণ্ডের ব্যক্তি সমষ্টি দল পরিচালনা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার যেই দায়িত্ব কারো ওপর অর্পণ করে সেটি আমানাত। কোন মাজলিসের কার্যবিবরণী (প্রসিডিংস) আমানাত। কেউ কারো নিকট কোন কিছু গচ্ছিত রাখলে সেটি আমানাত। কেউ কারো কাছে একান্ত গোপন কথা বলে থাকলে তা আমানাত।
খাঁটি মুমিনগণ কোন অবস্থাতেই আমানাতের খিয়ানাত করতে পারেন না।
আমানাতদারির গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
لاَ اِيْمَانَ لِمَنْ لاَ اَمَانَةَ لَه ০
‘যার আমানাতদারি নেই তার ঈমান নেই।’
[আনাস (রা), আহমাদ, আলবাযযার, আত্-তাবারানী, ইবনু হিব্বান]   ওয়াদা-প্রতিশ্র“তির ব্যাপ্তিও অনেক। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের সাথে কৃত ওয়াদা, ব্যক্তির সাথে কৃত ওয়াদা, জাতির সাথে জাতির চুক্তিÑ সবগুলোই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাঁটি মুমিনগণ কোন অবস্থাতেই ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি ভংগ করেন না।
সূরা বানী ইসরাঈলের ৩৪ নাম্বারে আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
وَاَوْفُوْا بِالْعَهْدِ اِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُوْلاً ০
‘এবং তোমরা ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।’
সূরা আন্ নাহলের ৯১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
وَاَوْفُوْا بِالْعَهْدِ اللهِ اِذَا عَاهَدْتُمْ ০
‘তোমরা যখন আল্লাহর নামে ওয়াদা কর, তা পূর্ণ কর।’
ওয়াদা-প্রতিশ্র“তির গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) বলেন,
لاَ اِيْمَانَ لِمَنْ لاَ اَمَانَةَ لَه وَلاَ دِيْنَ لِمَنْ لاَ عَهْدَ لَه ০
[আনাস (রা), আহমাদ, আলবাযযার, আত্-তাবারানী, ইবনু হিব্বান] ‘যার আমানাতদারি নেই তাঁর ঈমান নেই, যার ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি পালন নেই তার
দীনদারি নেই।’
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুনাফিকের পরিচয় চিহ্ন সম্পর্কে বলেন,
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ اِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَاِذَا وَعَدَ اَخْلَفَ وَاِذَا اُؤْتُمِنَ خَانَ ০
[আবু হুরাইরা (রা), ছাহীহ মুসলিম, ছাহীহ আলবুখারী] ‘মুনাফিকের পরিচয় চিহ্ন তিনটি। সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, সে ওয়াদা করলে তা ভংগ করে, এবং তার কাছে কোন কিছু আমানাত রাখলে সে খিয়ানাত করে।’
নবম আয়াত
وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلى صَلَواتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ ০
‘যারা তাদের ছালাতগুলোর হিফাযাত করে।’
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন সফলকাম মুমিনদের সপ্তম গুণ বা বৈশিষ্ট তুলে ধরেছেন।
সফলকাম মুমিনগণ সময় মতো তাঁদের ছালাত আদায় করেন। তাঁরা সঠিকভাবে নিয়ম-কানুন মেনে ছালাত আদায় করেন।
তাঁরা পবিত্রতা হাছিল করে ছালাত আদায় করেন। তাঁরা একাগ্রতা ও মানসিক প্রশান্তিসহকারে ছালাত আদায় করেন। তাঁরা ধীরে-সুস্থে ছালাত আদায় করেন।
এই ছালাতের মাধ্যমে তাঁরা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত হন। আর আল্লাহর সাথে এই সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণে তাঁরা অনুপম নৈতিক শক্তি অর্জন করেন।
দশম ও এগারতম আয়াত
اُولئِكَ هُمُ الْوَارِثُوْنَ ০ اَلَّذِيْنَ يَرِثُوْنَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ ০
‘এরাই উত্তরাধিকারী, এরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে আলফিরদাউস, যেখানে তারা থাকবে চিরদিন।’
এই আয়াত দুইটির মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জানিয়ে দিলেন যে উপরে বর্ণিত সাতটি গুণে যাঁরা গুণান্বিত হবেন, সাতটি বৈশিষ্টে যাঁরা বৈশিষ্টমণ্ডিত হবেন, তাঁরা পুরস্কার হিসেবে আলফিরদাউস লাভ করবেন। আর আলফিরদাউস হচ্ছে জান্নাতের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম অংশ।
আলফিরদাউস অনুপম নিয়ামতে পরিপূর্ণ স্থান। আলফিরদাউস অনন্ত সুখের স্থান। আলফিরদাউস সুখময় মৃত্যুহীন জীবন লাভের স্থান।
আলফিরদাউস লাভই বড়ো সফলতা। সেই সফলতা লাভের জন্য যেইসব গুণ-বৈশিষ্টের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন, তার মধ্য থেকে এই এগারোটি আয়াতে সাতটি গুণ-বৈশিষ্টের উল্লেখ করা হয়েছে।
৫। শিক্ষা
আখিরাতের অনন্ত জীবনে আলফিরদাউস লাভ করে সফল হওয়ার লক্ষ্যে আমাদেরকে-
(১)  খুশু সহকারে ছালাত আদায় করতে হবে,
(২)  বেহুদা কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে,
(৩)  আত্মশুদ্ধি ও সমাজ শুদ্ধির কাজে নিবেদিত থাকতে হবে,
(৪)  লজ্জাস্থানের হিফাযাত করতে হবে,
(৫)  আমানাতের হিফাযাত করতে হবে,
(৬)  ওয়াদা-প্রতিশ্র“তি রক্ষা করতে হবে এবং
(৭)  প্রতিটি ওয়াক্তের ছালাতের হিফাযাত করতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন আমাদেরকে সফলকাম মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফীক দান করুন! 

আপনার কোন মতামত থাকলে আমাদেরকে লিখে জানান

আরো দেখুন

BeautyPlus_20170414195724_save

ছাত্র মজলিস সিলেট মহানগরীর ক্যাম্পাস বিভাগের শিক্ষা সফর অনুষ্ঠিত

গত ১৪ এপ্রিল ১৭ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস সিলেট মহানগরীর ক্যাম্পাস বিভাগের উদ্যোগে এস এস ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *