BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
সংবাদ শিরোনাম
Home / মহানগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্য
250px-Sylhet

মহানগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্য

250px-Sylhet

সিলেটের ইতিহাস

কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে; যেমন; প্রাচীন অধিবাসী বিবরণ, ঐতিহাসিক বিবরণ, প্রাচীন রাজ্য সমুহ, আর্য যুগ, মোসলমান শাসিত আমল, মোগল আমল, ব্রিটিস আমল, পাকিস্তানে অর্ন্তভুক্তি, মুক্তি যুদ্ধ ও বাংলাদেশ। সিলেট বলতে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশের সিলেট বিভাগ বোজানো হয় যদ্ওি ঐতিহাসিক সিলেট অঞ্চলের কিছু াংশ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ ধেকে ভারতের আসাম রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়ে আছে৤

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রাচীন অধিবাসী বিবরণ

প্রাচীনকালে অস্ট্রেলীয়, দ্রাবিড় মঙ্গোলীয়সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সিলেট বিভাগে বসবাস করতেন। প্রমাণ হিসেবে এই অঞ্চলের বেড়ে ওঠা গৌরবময় প্রাচীন কৃষি সভ্যতাকে ধরা হয়[১]। ঐতিহাসিক অচ্যূতচরণ চৌধুরী এই বিভাগীয় অঞ্চলের প্রাচীনত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন[২]। নৃবিজ্ঞানের সূত্রে বলা হয় ভাষাগত দিক দিয়ে বিবেচনায় বলা হয়, আদি অস্ট্রেলীয়দের কথ্য ভাষার সাথে এখানকার আঞ্চলিক ভাষারও একটা মিল রয়েছে। কুড়ি (বিশ-সংখ্যা), গন্ডা (চার-সংখ্যা), নুন (লবণ), মিঠাই (মিষ্টী) ইত্যাদি সিলেটের মানুষের মুখের ভাষা, যাহা আদি অস্ট্রেলীয়দের ভাষা হিসেবে ধরা হয়। অস্ট্রেলীয়দের পরে কৃষিনির্ভর মঙ্গোলীয়দের এই অঞ্চলে আগমন ঘটে এবং কৃষিকর্মের মাধ্যমে তারা একে অন্যের সাথে মিশে যায়[১]

অস্ট্রেলীয়দের আগমনের কিছুকাল পরে এই অঞ্চলে মঙ্গোলীয়রা ও আলপীয়রা আসে[৩]। অতঃপর উক্ত জাতিগোষ্ঠীগুলো তন্ময়ভাবে একে অন্যের সাথে মিশে যায়।

Bodo dance

উল্লেখিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের ভিত্তিতে মনে করা হয় আদি অস্ট্রেলীয়, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়দের থেকে বেড়ে উঠেছে সিলেট বিভাগের প্রাচীন জনপদ ।[১][২][৪]

সিলেটের জাফলং এ খাশিয়া আদিবাসী

শ্রীহট্ট বা সিলেট বিভাগে প্রাচীন কালে যে সব জাতিগোষ্টী বসবাস করতো, তাদের মধ্যে অনেকটি ছিল হিন্দুধর্ম্মাবলম্বী। যারা হিন্দু নয়, তারা ভূত, বৃক্ষ বা পশুর উপাসনা করতো। আবার বিভিন্ন সময়ে কেহ কেহ হিন্দু ধর্ম বর্জন করেছে। উক্ত আদিবাসীদের মধ্যে কুকি, খাসিয়া, তিপরা, মণিপুরী ও লালুং ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী প্রাচীন। অনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের পরে এদেশে আর্যজাতির আগমন ঘটে। আর্যদের পূর্বে কুকিরাই এই অঞ্চলের মালিক ছিল বলে ধারণ করা হয়। আর্যজাতি এদেরকে বিতাড়িত করেছে বলে জানা যায়। কুকিদের মধ্যে অনেকেই হিন্দু ধর্ম অবলম্বন করে হালাম বা তিপরা বলে পরিচয় দিয়া থাকে।[২]

ঐতিহাসিক বিবরণ

অচ্যূতচরণ চৌধুরী সহ ইতিহাসবিদেরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ধারণা করেন; গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের সমস্ত উত্তর-পূর্ব অঞ্চল নিয়েই গঠিত ছিল প্রাচীন কামরুপ রাজ্য। যার অন্তরভুক্ত ছিল প্রাচীন শ্রীহট্ট বা সিলেট বিভাগ। গ্রীক বণিকের বরাত দিয়ে বলা হয়, গ্রীক বণিক ‘টলেমির’ বাণিজ্য বিস্তার গ্রন্থের অনুবাদে বলা হয়েছে “কিরাদিয়া” বা কিরাত দেশের উত্তরে পার্শবর্তী দেশই প্রাচীন শ্রীহট্ট ভুমী। উল্লেখিত তথ্য মতে শ্রীহট্ট বা সিলেট বিভাগকে একটি প্রাচীন জনপদ ধরা হয়। তদুপরি প্রাচীন কামরুপ রাজ্যের অদিপতি ভগদত্ত রাজার উপ-রাজধানী সিলেট বিভাগের লাউড় পর্বতে বিদ্যমান থাকা এই অঞ্চলের সর্ব-প্রাচীন নিদর্শন[১][২]। শ্রীহট্ট অঞ্চলে জনশ্রুতি রয়েছে, পৌরাণিক যুগে মহাভারত সমরে নিহত ভগদত্ত রাজা কামরুপ রাজ্যের শাসক ছিলেন। রাজা ভগদত্তের আমলে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার আওতাধীন লাউড় অঞ্চলে কামরুপ রাজ্যের শাখা রাজধানী ছিল। লাউড় অঞ্চলে উচু একটি পাহাড় দেখাইয়া লোকে সেখানে রাজা ভগদত্তের রাজধানীর নির্দেশ করিয়া থাকে। পৌরাণিক কালে কামরুপ রাজা ভগদত্ত এদেশে (শ্রীহট্টে) আসলে লাউড়ের রাজধানী হতে দিনারপুরের প্রাচীন বাণিজ্য ঘাটি (বর্তমান দিনারপুর সদরঘাট) পর্যন্ত নৌকায় ভ্রমন করতেন। লাউড় পাহাড়ের সুরঙ্গ স্থানে রাজা ভগদত্তের রাজ বাড়ী ছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই রাজ বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান।[৫]

প্রাচীনকালে হিন্দু রাজাদের দ্বারা এদেশ (সিলেট) শাসিত হয়েছে, যার অনুমান করা হয় নিধনপুরে প্রাপ্ত ভাস্করভর্মনের তাম্রলিপি সহ ভাটেরায় প্রাপ্ত আরো দুই খানা ঐতিহাসিক তাম্রফলক। শ্রী যুক্ত স্বরুপ রায় “শ্রীহট্ট ভূগোল ও মৌলবী আহমদ সাহেব শ্রীহট্ট দর্পন পুস্তকে লিখেছেন, উক্ত তাম্র ফলকদ্বয় পাঠে সাগর পশ্চিমে পদ পাওয়া যায়। পরবর্তিতে প্রত্নতত্ববিদ ডঃ রাজেন্দ্র লাল মিত্র উক্ত ফলকদ্বয় পাঠ করে এদেশের পশ্চিমাংশে প্রাচীন কালে বিরাট সাগর বিদ্যমান ছিল বলে, অর্থ করেন। ঐতিহাসিক অচ্যুতচরন চৌধুরী ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থের বরাতে লিখেন, শ্রীহট্টের দক্ষিণ পশ্চিমাংশ, ময়মনসিংহের পূর্বাংশ, ত্রিপুরার উত্তর পশ্চিমাংশে পুরাকালে বৃহত্তর হ্নদ ছিল। পরে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ইহা বরাট হয়ে, ঢাকা ময়মনসিং ও ত্রিপুরার সন্ধিস্থলে পরিণত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের চীনা পর্যটক হিয়েং সাং এই অঞ্চল ভ্রমন করে, শিলিচতলকে (শ্রীহট্টকে) সমদ্র নিকট বর্তী দেশ উল্লেখ করেন [২][৬]

গবেষনা ও নৃতাত্ত্বিকভাবে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আর্যজাতির আগমন কাল চতুর্থ-পঞ্চম শতক ধরা হয়। [৪] ভারতবর্ষের আর্যযুগের শুরুতে যখন বঙ্গদেশে জনবসতি স্থাপনের প্রমাণ ছিলনা, তখন সিলেট একটি দেশ হিসেবে খ্যাত ছিল। যখন রামায়ন লিখিত হয় তখন বঙ্গভূমী আর্যগণের কাছে পরিচিত ছিল, কিন্তু মানুষ বাসযোগ্য ছিল না। সে সময় উত্তর-পূর্ব বঙ্গই বঙ্গভূমী হিসেবে বাসযোগ্য ছিল।

ব্ৰহ্মপুত্রের যাত্রাপথের মানচিত্র

সিলেট বা শ্রীহট্টের উক্ত উচ্চাংশ সহ ত্রিপুরা ইত্যাদি অঞ্চল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, অথবা শ্রীহট্ট (উত্তর-পূর্ব বঙ্গ) ইত্যাদি নামে পরিচিত হতো। ভূ-তত্ববিদ বম্কিমচন্দ্র ও রমেশচন্দ্র গংদের বরাতে “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” ও অন্যান্য ঐতিহাসিক গ্রন্থে আরও লিখিত আছে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে সিলেট সভ্য জাতির আবাসভূমি ছিল। ইহা প্রাচীন গ্রন্থাদি সহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। বরাক বা বরবক্র, সুরমা, কুশিয়ারা এই বিভাগের প্রধান নদী। মণু ও ক্ষমা (খোয়াই) ইত্যাদি ক্ষীন নদী বরবক্রে মিশে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাচীন শাস্ত্রে আছে বরবক্র নদী পাপ নাশক। শাস্ত্র গ্রন্থের বরাতে বলা হয় সত্য যুগে “মণু নামের ভগবান” মণু নদীর তীরে শিব পুজা করতেন বলে এই নদীর নাম মণু নদী হয়েছে। শাস্ত্রে বিশ্বাসী হিন্দুগণ বরবক্র ও মণু নদীতে তীর্থযাত্রায় আসতো। বরবক্র, মণু ও ক্ষমা (খোয়াই) নদীগুলো এ অঞ্চলের ভূমি বিস্তার এবং উক্ত নদী গুলোকে ঘিরে তীর্থযাত্রীদের আসার মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের জনবসতি বিস্তারের প্রধান কারণ হিসেবে অনুমান করা হয়[কে?] [২],[৭]। রামায়ণে উল্লেখিত চন্দ্রবংশীয় রাজা অমুর্ত্তরাজা পণ্ড্রভূমী অতিক্রম করে যখন কামরুপে প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য স্থাপন করেন, তখন বিম্রামিত্রের পুত্রগণ পিতার অভিশাপে অনার্য্যত্ব প্রাপ্ত হইয়া পণ্ড্র ভূমিতে বাস করতো। রামায়ণে অয্যোধ্যাকাণ্ডে সূত্রে লিখা হয়েছে; দশরথ রাজা যখন কৈকেয়িকে তার (দশরত রাজার) অধিকৃত দেশগুলোর কথা বলেছেন, তার মধ্যে বিশেষ দশটি জনপদের উল্লেখ আছে; সেগুলো দ্রাবিড়, সিন্ধু, সৌরাষ্ট, সৌবির, দক্ষিণাপথ, অঙ্গ, বঙ্গ, মগদ, মৎস ও কোশাল রাজ্য । উক্ত দশটি রাজ্যের মধ্যে যে বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে, উহা মুলতঃ ছিল ব্রহ্মপুত্র নদের প্রশ্চিমে অবস্থিত বর্তমান “ভাগলপুর” অঞ্চল [২]

বাংলার ইতিহাসে বলা হয় যে, প্রাচীন কালে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক করে রেখেছিল। পূর্ব বঙ্গের (বাংলাদেশের) সিলেট, ঢাকা, রংপুর (<নবঘটিত) ও চট্টগ্রাম বিভাগ ও ভুটান এবং আসাম তখন কার সময়ে কামরুপ রাজ্যের অধীন গণ্য ছিল[৪]। পুর্ব বঙ্গের উল্লেখিত অঞ্চল গুলোর মধ্যে সিলেটই সর্ব প্রাচীন হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাচীন (Ancient) ইন্ডিয়া গ্রন্থে পাওয়া যায়, প্রাচীন কালে কামরুপ রাজ্য প্রাচীন নদী ‘করতোয়া’ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (On the Early 6th century A.D. Kamarupa became a powerful kingdom. It included the whole of the brahmaputra vally and sylhet, and extended to west as far as Karatoya riverwhich continued to be the traditional boundary of kamarupa for a long time).[৮]

মহাস্থানগড়ের নিকটে করতোয়া নদী

প্রাচীন গ্রন্থ সমুহ, স্থাপত্য, জনশ্রুতি ও পুরাকীর্তি সূত্রে ধারনা করা হয়, মহাভারত সমরে নিহত কামরুপ রাজা ভগদত্তের পরে তাঁর (ভগদত্ত রাজার) বংশীয় ১৯ জন নৃপতি শ্রীহট্ট অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন[২]ইতিহাস গবেষক দেওয়ান নুরুল আনওয়ার জালালাবাদের কথা গ্রন্থে লিখেছেন খ্রিস্টিয় সপ্তম শতক পর্যন্ত সিলেট কামরুপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। নিধনপুরে প্রাপ্ত “ভাস্করবর্মনের তাম্রলিপি সূত্রে বলা হয় ভাস্করবর্মন খ্রিস্টীয় ৬৫০ সাল পর্যন্ত সমস্ত উত্তর পূর্ব ভারত সহ শ্রীহট্টে রাজত্ব করেছেন [৪]। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে (Journal) ভাস্করবর্মনের আমন্ত্রনে আগত হিয়েং সাংএর ভ্রমনের লিপিবদ্ধ বর্ণনায় যে ছয়টি দেশের উল্লেক পাওয়া যায় তার মধ্যে সমতট, তাম্রলিপ্ত ও শিলিচাটল উল্লেখ্য যোগ[৬]। উল্লেখিত তথ্য মতে “শিলিচাটল”ই হচ্ছে প্রাচীন শ্রীহট্ট বর্তমান বাংলাদেশের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল সিলেট বিভাগ। ভাস্করবর্মনের পর স্লেচ্ছাদিনাথ শালস্থম্ভ (৬৫০-৬৭৫) দ্বারা বর্মনদের সিংহাসন অধিকৃত হয়। শালস্থম্ভ নিজেকে ভগদত্ত বংশীয় বা বর্মনদের উত্তরসুরী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। শালস্থম্ভের অধঃস্থন রাজা হর্ষবর্মন (রাজত্বকাল, ৭৩০-৭৫০) অত্র রাজ্যে রাজত্ব করেন। ব্রহ্মপুত্র পরবর্তি সমস্ত রাজ্য সমুহে হর্ষবর্ধনের সময় বিরাট ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির অভিমত রয়েছে। যার সূত্র ধরে সমস্ত বঙ্গ দেশ বিভিন্ন খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত হয়ছে বলে অনুমান করা হয় [৪][৮]। তত্কালে ত্রিপুরীদের রাজ্য “কিরাত ভূমী হতে কাছারে স্থানান্তর হয় এবং শ্রীহট্টের কাছার, তরফ ও মনুকুল প্রদেশ সহ কুমিল্লা ও ঢাকার অনেকাংশ ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়[২][৭] এবং তত্কালে শ্রীহট্টের প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরুপ হতে বিভক্ত হয়ে একটি পৃথক স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিণত হয় বলে জানা যায় [১]

প্রাচীন রাজ্য সমুহ

স্মৃতি, স্থাপত্য, জনশ্রুতি ও পুরাকীর্তি ইত্যাদির ভিত্তিতে বলা হয় প্রাচীন শ্রীহট্টের লাউড় পর্বতে রাজা ভগদত্তের উপ-রাজধানী ছিল এবং শ্রীহট্টাঞ্চলে ইহাই সর্ব প্রাচীন রাজ্য বলে ধরা হয়। এছাড়া শ্রীহট্ট বা সিলেট বিভাগে আরো একটি প্রাচীন রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে। যা প্রাচীন জয়ন্তীয়া রাজ্য নামে খ্যাত। অচ্যূতচরণ চৌধুরী জয়ন্তীয়া রাজ্যকে মহাভারত সময় কালের বলে বর্ণনা দিয়েছেন[২]। মহাভারত সময় কালে জয়ন্তীয়া রাজ্যের অধীশ্বরী ছিলেন প্রমীলা। মহাভারত ও অন্যান্য শাস্ত্র গ্রন্থের বরাতে বলা হয়; কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বিবরণীতে মহাবীর অর্জুনের স্ত্রী রাজ্য গমনের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাহা এই জয়ন্তীয়া রাজ্য। মহাবীর অর্জুন যধিষ্টরের “অশ্ব মেধযজ্ঞে” জয়ন্তীয়া রাজ্যে এসেছিলেন। বীর নারী প্রমীলা কর্তৃক অশ্ব মেধ বেঁধে রাখার কারণ অর্জুনের সাথে রাণীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অবশেষে জয়ন্তীয়া রাণী অর্জুনের কাছে পরাজিত হলে অর্জুনের সথে তার বিবাহ হয় এবং জয়ন্তীয়া জয়ের পরে বীর অর্জুন তথা হতে মণিপুর রাজ্যে গিয়েছিলেন। উক্ত ঘটনার পর দীর্ঘকাল যাবত জয়ন্তীয়া হিন্দু রাজাদের দ্বারা শাসিত হতো। এগার’শ শতকে জয়ন্তীয়ায় কামদেব নামে অধীপতির রাজত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। মোলব (সম্ভবত মোগলদের অধিকার ভুক্ত কোন সামন্ত রাজ্য) দেশের পণ্ডিত কবিরাজ কামদেবের আমন্ত্রণে জয়ন্তীয়ায় এসেছিলেন এবং জয়ন্তীয়াপতির উত্সাহে তিনি “রাধব পণ্ডব” নামের শাস্ত্র গ্রন্থের রচনা করেন। কামদেবের সময় কালে জয়ন্তীয়া রাজ্যকে কামরুপের খণ্ড রাজ্য হিসেবে ধরা হতো। কামদেব বংশীয় রাজাদের দীর্ঘ কাল পরে (প্রায় ১৫০০শতকে) কোচ বা খাসিয়াগণের নিয়ন্ত্রণে জয়ন্তীয়া শাসিত হয় এবং মোগলদের পরে ইহা ইংরেজদের অধিকারে আসে[১][২]

  • গৌড় রাজ্য — সিলেট শহরের প্রাণ কেন্দ্রে ইহার অবস্থান ছিল। ঐতিহাসিক মুমিনুল হকের মতে প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরুপ হতে পৃথক (৭৫০ খ্রিঃ) হওয়ার পর প্রায় দশম শতকে লাউড় রাজ্য, জয়ন্তীয়া ও গৌড় রাজ্যে বিভক্ত হয়ে স্বাধীন ভাবে শাসিত হয়। উক্ত রাজবংশের উত্তরসুরী রাজা গোড়ক অত্রাঞ্চলের অধীকার প্রাপ্ত হয়ে তার নামানুসারে রাজ্যের নাম রাখেন গৌড় রাজ্য[১]। ইহার অবস্থান সিলেট শহর ও শহরের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে বহু দুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এক সময় ইটা রাজ্য, তরফ রাজ্য, প্রতাফগড় রাজ্য সহ আরো অনেকটি রাজ্য গৌড়ের অধীনস্থ ছিল। রাজনৈতিক, ভূগৌলিক, সামাজিক ও সাহিত্যিক ভাবে গৌড় রাজ্য সিলেট বিভাগের ইতিহাসে সর্বদিগে প্রসিদ্ধ। [২]। রাজা গৌড় গোবিন্দ ছিলেন ইহার শেষ শাসক। রাজা গোবিন্দ সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিকঅচ্যুতচরণ চৌধুরী রাজা গোবিন্দকে সমুদ্রতনয় বলে পরিচয় করেন। উল্লেখ্য যে, গোবিন্দ গৌড় রাজ্যের অধিপতি বলে গৌড় গোবিন্দ নামে অভিহিত হন[২]। কথিত আছে, তুর্কি সেনাদের ‘বাংলা বিজয়ের’ পর শ্রীহট্টে মুসলমান জন বসতির আলামত পরিলক্ষিত হয়। সৈয়দ মোস্তফা কামালের মতে, তত্কালে সিলেটের টুলটিকর মহল্লায় ও হবিগঞ্জের তরফে মুসলমান বসতি ছিল। উল্লেখ্য যে, সিলেটের টুলটিকর মহল্লার বাসীন্দা গাজি বুরহান উদ্দীন তাঁর গৃহে নবজাত শিশুর জন্ম উপলক্ষে, গরু জাবাই করলে গৌড় গোবিন্দ তাহা সহ্য করতে না পেরে গাজি বুরহান উদ্দীনের শিশু সন্তানকে নির্মম ভাবে হত্যা করে[৯]। কিংবদন্তী মতানুসারে খ্রিস্টীয় ১৩০৩ সালে শাহ জালাল মুজররদ (রহ) ৩৬০ জন সঙ্গী সহ দিল্লির সুলতান্দের প্রেরিত সিকান্দর গাজীর সাথে গৌড় রাজ্যে উপনীত হন। কথিত আছে, রাজা গৌড় গোবিন্দ জাদু-বিদ্যায় পারদর্শী ছিল এবং শাহ জালাল (রহ) আগমন লক্ষ্য করে বিভিন্ন ভাবে শাহ জালালের গৌড় অনুপ্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করে। শাহ জালালা (রহ) আধ্যাতিক সাধনায় বিনা সমরে গৌড়ে প্রবেশ করেন এবং গৌড় রাজ্য মুসলমানদের দ্বারা অধিকৃত হয়। এভাবেই গৌড় রাজ্য দিল্লীর সুলতানদের অধিকারে আসে। পরবর্তিতে, সিলেট মোগল শাসনে আসে ১৬১২ সালে[২][৯]।।
  • জগন্নাথপুর রাজ্য — সিলেট শহর হতে ২৫ মাইল পশ্চিমে জগন্নাথপুর উপজেলার পান্ডুয়া (বর্তমান-পেড়ুয়া) নামক স্থানে ইহার রাজধানী ছিল। ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে রাজা বিজয় মাণিক্য দ্বারা ইহা স্থাপিত। তত্কালে রাজা বিজয় মাণিক্য লাউড় রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। রাজা বিজয় মাণিক্য জগন্নাথ মিশ্র নামক বিপ্রকে দিয়ে বাসুদেব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরে জগন্নাথ মিশ্রের নামানুসারে রাজ্যের নাম “জগন্নাথপুর” রাখেন, সেই থেকে জগন্নাথপুর রাজা বিজয় মাণিক্যের রাজ্য বলে ঘোষিত হয়। ১৬ শ শতক পর্যন্ত ইহা প্রাচীন লাউড় রাজ্যের অঙ্গ রাজ্য ছিল। তত্পরবর্তিতে লাউড়ের রাজ বংশের পৃথক রাজ্য হিসেবে খ্যাত হয়। এই রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শন, রাজা বিজয় মাণিক্যের ছিক্কা মুদ্রা ও প্রস্তর দ্বারা নির্মিত বাসুদেব মন্দির।
  • তরফ রাজ্য — সিলেট বিভাগের বর্তমান হবিগঞ্জ সদর, মাধবপুর, লাখাই, বাহুবল, চুনারুঘাট, শ্রীমঙ্গল, নবীগঞ্জ এবং বাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, ও নেত্রকোনা জেলার জোয়ানশাহী পরগনা নিয়ে তরফ রাজ্য বিস্তৃত ছিল। ইহার পূর্বনাম তুঙ্গাচল বা রাজপুর, যা ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের অধীন একটি সামন্ত রাজ্য। রাজপুরের সামন্ত তিপ্রা রাজা ত্রপিবিঞ্চু মারা গেলে, রাজকন্যা লালসা দেবিকে বিয়ে করে আচানক নারায়ন ইহার রাজা হন। রাজা আচানক নারায়নের সময় কালে তরফে কয়েকটি মুসলমান পরিবার বসবাস করেছিল। তরফের রাজা আচানক নারায়ন কর্তৃক মুসলমানরা প্রায়ই নির্যাতিত হতেন। ১৩০৩ সালে শাহ জালাল আউলিয়া (রঃ) কর্তৃক গৌড় রাজ্য বিজিত হলে, ১৩০৪ সালে শাহ জালাল আউলিয়া (রহ) এর অনুসারী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রহ) ১২ জন সঙ্গী সাথীদের নিয়ে তরফ অভিযানে যান। সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে ইহা বিজিত হয়ে গৌড় রাজ্যের অধীনে আসে। সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রহ) এর বিজিত উক্ত ভূমীকে বার আউলিয়ার মুল্লুক বলা হয়ে থাকে।
  • প্রতাপগড় রাজ্য–প্রাচীন কালে প্রতাপগড়ের নাম সোণাই কাঞ্চন পুর ছিল। প্রতাপ সিংহ নামে জনৈক হিন্দু রাজা এই স্থানে বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ইহার নাম প্রতাপগড় রাখেন। পরবর্তিকালে প্রতাপ সিংহ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে প্রতাপগড়ের এক সাধারণ মুসলমান আমীর আজাফর প্রতাপ সিংহের রাজ বাড়ির অধিকার প্রাপ্ত হন। ঐ সময় দেওরালি অঞ্চলে ত্রিপুরার সামান্ত পোরারাজার এক ছোট রাজ্য ছিল। এই পোরা রাজার মাধ্যমে প্রতাপগড় রাজ্যের সমুদয় এলাকা ত্রিপুরিদের অধিকারে আসে। খ্রিস্টীয় চৌদ্দ শতকের শেষভাগে মির্জা মালিক তোরাণি নামের এক যুবক ব্যক্তি দল-বল সহ পারস্য হতে ভারতের দিল্লী হয়ে উক্ত দেওরালিতে উপনীত হন এবং ঘটনা ক্রমে পোরারাজার সাথে যুদ্ধ হয়। পোরারাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাজার কন্যা উমাকে, মির্জা মালিক তোরাণির কাছে বিবাহউত্তর স্বরাজ্য দান করেন। পরবর্তিকালে মির্জা মালিকের বংশে মালিক প্রতাব নামের এক ব্যক্তি শিকারের জন্য প্রতাপগড়ে উপনীত হন। অতঃপর উপরোল্লেখিত আমীর আজাফরের বংশে বিবাহ করে, প্রতাপগড়ের রাজ বাড়ির অধিকার প্রাপ্ত হন। প্রতাপগড় এলাকা তখনকার সময়ে বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। মালিক প্রতাব বন-জঙ্গল অপসারণ করিয়া তথায় জন বসতি স্থাপন করেন এবং মসজিদ ইত্যাদি প্রস্তুত করে জঙ্গল ভূমিকে জনপদে পরিণত করেন। সেই থেকে মালিক প্রতাবের নামে প্রতাপগড় প্রতাবগড় নামে পরিচিত হতে থাকে। পরবর্তিকালে ময়মনসিংহের জঙ্গলবাড়ী পর্যন্ত প্রতাবগড় রাজ্য বিস্তৃত ছিল। পরে কাছার রাজ্যের সাথে যুদ্ধ বাঁধলে অত্র রাজ্য কাছারের কমলা রাণীর অধিকারে আসে।
  • বানিয়াচং রাজ্য — পনেরো’শ শতকে হবিগঞ্জ জেলার ভাটি অঞ্চলে বানিয়াচং রাজ্য স্থাপিত হয়। এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কেশব একজন বণিক ছিলেন। তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এদেশে এসেছিলেন এবং কালী নামের দেবির পুজা নির্বাহের লক্ষ্যে দৈব্ বাণীতে শুকনো ভূমির সন্ধান প্রাপ্ত হয়ে সেখানে অবতরণ করে দেবি পুজা সমাধান করে দৈব বাণী মতে সেখানেই বসতি স্থাপন করেন। এক সময় শ্রীহট্টের উত্তর সীমা হতে ভেড়ামোহনা নদী পর্যন্ত বানিয়াচং রাজ্য বিস্তৃত ছিল। প্রায় শতের’শ শতকের শেষের দিকে গোবিন্দ খাঁ কর্তৃক শ্রীহট্ট ভূমীর প্রাচীন রাজ্য “লাউড়” ইহার অধিকার ভূক্ত হয়। যাহা মূলত তত্কালে জগন্নাপুর রাজ্যের রাজ্ বংশের অধিকারে আসার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ জগন্নাপুর রাজ্যের রাজ্ বংশ তাদের অধিকার হারায় এবং ইহার যের ধরে দুই রাজ্যের মধ্যে হতা-হতীর কারণ জগন্নাপুর রাজ্যের রাজ্ বংশ ধংশ হয় । ঐ সময়ে বানিয়াচং রাজা গোবিন্দ খাঁ দিল্লীর সম্রাটদের দ্বারা মোসলমান হয়ে, হাবিব খাঁ নাম ধারণ করে দেশে ফিরেন। বাংলার জনপ্রিয় “আপন-দুললা” কিচ্ছার-কাহীনি এই রাজ বংশেরই লোকগাঁতা বলে ইতিহাসবিদেরা বলেন। বর্তমান বানিয়াচং গ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ব বৃত্ত্তর গ্রাম বলে ধারনা করা হয়।
  • ইটা রাজ্য — ইটা রাজ্য সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের এক অংশ। বর্তমান সিলেট জেলাধিন বিয়ানীবাজার থানার অর্ন্তগত ঐতিহাসিক গ্রাম নিদনপুর হতে ‘ভাস্করবর্মনের তাম্রলিপি’ পাওয়ার কারণে এই গ্রাম শ্রীহট্টের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাচীন কালে শ্রীহট্ট জেলার দক্ষিণাংশ মনুকুল প্রদেশ হিসেবে পরিচিত হতো। বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশের কিছু অংশ ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত এবং অন্যান্য সব অংশ কামরুপের এলাকা ছিল। খ্রিস্টিয় সপ্তম শতকের প্রথম দিকে ত্রিপুরার রাজা ‘ধর্ম ফাঁ’ এক রাজ যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং যজ্ঞ পরিচালনার জন্য পশ্চিম বঙ্গের ‘মিতিলা’ ও ‘কনৌজ’ হতে পাঁচ জন প্রসিদ্ধ বৈদিক ব্রাহ্মণকে শ্রীহট্টে আনেন। ত্রিপুরার রাজা ‘ধর্ম ফাঁ’ উল্লেখিত পাঁচ ব্রাহ্মণকে হাকালুকি হাওয়রের পশ্চিমে কিছু ভূমী দান করেন। উল্লেখ যে, উক্ত হাকালুকি হাওয়রের পূর্ব ও দক্ষিণাংশে তৎকালে কুকিদের উপ-জাতীয় হাঙ্কালা” ও টেঙ্করী” নামের দুই সম্প্রদায় বাস করতো। ব্রাহ্মণদের ভূমী দান করার পরে উক্ত কুকিরা স্থান ত্যাগ করে পাহাড়ে চলে যায় এবং কুকিদের ত্যাগ করা উক্ত ভূমী উল্লেখিত পাঁচ ব্রাহ্মণ- শ্রীনন্দ, আনন্দ, গোবিন্দ, পুরুষোত্ত ও শ্রীপতি কে ত্রিপুরার রাজ কর্তৃক ভাগ করে দেয়া হয়। অতপর ব্রাহ্মণ বসতির এই স্থান পঞ্চখন্ড (বিয়ানীবাজার) নামে পরিচিত হয়। পরবর্তিকালে উক্ত ব্রাহ্মণদের হতে আনন্দ শাস্ত্রীর বংশের নিধিপতি শাস্ত্রী নামক ব্যক্তি “ইটা” রাজ্য পত্তন করেন। (বাড়তি পঠনঃ-সিলেট বিভাগের ভৌগোলিক ঐতিহাসিক রুপরেখা, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, প্রকাশক- শেখ ফারুক আহমদ, পলাশ সেবা ট্রাস্ট সিলেট, প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃঃ ১০, সিলেট বিভাগের ইতিবৃত্ত, মোহাম্মদ মুমিনুল হক, গ্রন্থ প্রকাশকাল, সেপ্টেম্বর ২০০১, শ্রীহট্টে ইসলাম জ্যোতি, মুফতি আজহারুদ্দীন সিদ্দিকি, ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ অচ্যুতচরণ চৌধুরী,[১০]

আর্য যুগ

ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলী‘র মতে পঞ্চম হতে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে আর্যরা এই অঞ্চলে এসেছেন। আর্যরা আসার পূর্বে অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় নরগোষ্টি ছিলেন এ অঞ্চলের আদিম আধিবাসী। আজকাল অস্ট্রিকরা ভেড্ডী বলে নিজেদের পরিচয় দেয়। এদের বড় জাতের লোক পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করতো[১১]। অপর ইতিহাস ব্রেতা মুমিনুল হক উক্ত জাতিগোষ্ঠির বর্ণনায় লিখেনঃ-তাদের (অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় নরগোষ্টি) দেহের গঠন মাঝারী ধরণের, বাঁকা চোখ, গায়ের রং শ্যামলা ছিল। তারা হাড় ও পাথর দিয়ে অস্ত্র তৈরী করতো। ধান, পান, সুপারী, আদা, কলা ও হলুদ ছিল ঐ জাতিগোষ্ঠীর লোকের প্রাধান কৃষিজাত বস্তু। এছাড়া অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় উভয় নরগোষ্ঠী ডিঙ্গি নৌকা ও ভেলা চড়ে জলপথে যাত্রা করত এবং নদী, খাল, হাওর ও বিলে মাছ ধরে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরী করে রাখতো। যা তাদের খাদ্য সংকটে ব্যবহারে লাগতো। পরবর্তিতে অনুমানীক পঞ্চম শতকে নাক লম্বা, মাথা মোটা, গৌর বর্ণের আর্যজাতীর এ অঞ্চলে আগমন ঘটে এবং হিন্দু বর্ণের উপর আধিপত্ত বিস্তার করে। এই সময়ে সিলেটের প্রাচীন সংস্কৃতিতে ভারতীয় আর্য সংস্কৃতির মিশ্রন ঘটে[১]। তত্কালে সিলেটের কাছার ও আসাম প্রভৃতি জোড়ে কামরুপ রাজ্য বিস্তৃত ছিল এবং শাসন দণ্ডে আর্যদের অধিকার ছিল বলে ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ সহ প্রায় সকলেই উল্লেখ করেছেন। রমেস চন্দ্র মজুমদার তার এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া (Ancient India) গ্রন্থে বাংলাদেশের রংপুর থেকে বগুরার করতোয়া নদী পর্যন্ত অত্র অঞ্চল কামরুপের অন্তর্গত ছিল বলে দেখিয়েছেন এবং সিলেট সহ বাংলাদেশের উল্লেখিত অলঞ্চ গুলো আর্যজাতীয় শাসকদের দ্বারা শাসিত হতো। খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত সিলেট সহ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সমস্ত অঞ্চল অর্থাৎ আসাম মণিপুর কাছার ময়মনসিংহ জলপাইগুড়ি রংপুর ত্রিপুরা ইত্যাদিতে আর্যজাতীরাই শাসন দণ্ড পরিচালনা করত। আর্যদের অধিকারে তত্কালে সিলেটের লাউড় অঞ্চলে আর্য রাজ্য থাকার প্রমাণ অচ্যুতচরণ চৌধুরী তার শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে দিয়েছেন।[২] ১৮৭২ সালে ভাটেরায় প্রাপ্ত তাম্রলিপি থেকে জানা যায় নবনীর্বান, গণগুণ নারায়ন ও গোবিন্দকেশব দেব নামক রাজাগণ এ অঞ্চলে এক সময় রাজত্ব করেছেন। অচ্যুতচরণ চৌধুরীর মতে ওরা আর্যবংশীয় রাজা ছিলেন। ঐতিহাসিক মতে দশম শতাব্দীতে বঙ্গদেশে যখন পাল রাজারা রাজ্যত্য করে সিলেটে তাদের অধিপত্য ছিল বলে কোন উল্লেখ নাই। সিলেটের প্রাচীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার উল্লেখ সম্পর্কে এ অঞ্চলে প্রাপ্ত শিলালিপি, তাম্রলিপি, লোকগাঁতা ইত্যাদি সূত্রে বলা হয়; মহারাজ শ্রী চন্দ্রের সময়ে পৌণ্ডবর্ধন প্রদেশ বা ভুক্তির অন্তর্গত ছিল শ্রীহট্ট অঞ্চল। তখন শ্রীহট্ট মণ্ডল নামে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়। [১২]

মোসলমান শাসিত আমল

১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে শাহ জালাল কর্তৃক ৩৬০ আউলিয়ার মাধ্যমে সিলেট বিজয় সম্পুণ্য হয় বলে স্বীকৃত। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে সিলেটে সুলতানী শাসনের সুত্রপাত ঘটে। সুলতানদের আমলে এ অঞ্চলের প্রশাসন ব্যবস্থাকে কয়েকটি ইকলিমে বা ইক্তায় বিভক্ত করা হয়। ইক্তার প্রাশাসককে ওজীর বলা হত।[১] সিলেটের সর্ব প্রথম ওজীর হন সিকান্দর খান গাজী। এ সময় দিল্লীর সুলতানী পদে উপবিষ্ট ছিলেন আলাউদ্দীন খিলজী এবং বাংলার তত্কালীন সম্রাট ছিলেন শামস উদ্দীন ফিরুজ শাহ। সিকান্দর গাজী কয়েক বত্সর শাসন পরিচালনা করেন এবং শাহ জালাল জীবিত থাকা কালেই সিকান্দর গাজী এক নৌকা ডুবিতে মৃত্যু বরণ করেন। এ বিষয়টি তোয়ারিখে জালালী গ্রন্থে কবিতায় এ ভাবে উল্লেখ আছেঃ

যখনে মরিল সেই গাজী সিকান্দর
বেসরদার হৈল ছিলট নগর
এজন্যে হযরত শাহ জালাল এমনী
নিযুক্ত করি দেন সরদার তখনি[১৩]সিকান্দর গাজীর পরে শাহ জালালের অন্য সঙ্গী অনুসারী হায়দর গাজী উপর সিলেটের শাসন ভার ন্যস্ত হয়।[২][১৪] হায়দর গাজীর মৃত্যুর পর কার দ্বারা সিলেটের শাসন পরিচালিত হয়, তা অজ্ঞাত । অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির ধারণা করেন; হায়দর গাজীর পরে নবাব ইস্পেন্দিয়ার দ্বারা শাসিত হতে পারে। অতপর দিনাজপুরের রাজা গনেশ কর্তৃক গৌড়াধিপতি শামস উদ্দীন যখন নিহ্ত হন তখন সিলেটের শাসনকার্য কি ভাবে চলে ছিল তা জ্ঞাত হওয়া যায় নাই। এরপর গৌড় সম্রাট ইলিয়াছ বংশীয় বরবক শাহের পর ইউছুফ শাহের আমলে (১৪৮২ পুর্ব) সিলেটের সাথে গৌড়ের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। শাহ জালালের দরগাহে প্রাপ্ত প্রস্তরলিপিতে ইউছুফ শাহের নাম অঙ্কিত থাকা এর প্রমান বলে অচ্যুতচরণ চৌধুরী মনে করেন। এ বংশীয় গৌড়ের শেষ রাজা মোজাফরের আমল (১৪৯৫ খ্রিঃ) পর্যন্ত গৌড়ের ছত্র-ছায়ায় থাকিয়া শাহ জালালের দরগাহের খাদিম গণ দ্বারা সিলেটের শাসন দণ্ড পরিচালিত হয়। [২] অতপর হুসেন শাহের আমলে ময়মনসিংহ, ঢাকা, নেত্রকোনা, কিশুরগঞ্জ সহ সিলেটের সুনামগঞ্জ এলাকার নিম্না অঞ্চল নিয়ে ইকলিমে মুয়াজ্জমাবাদ নামে একটি প্রশাসনিক ইউনিট (প্রদেশ) ঘটিত হয়। এ সময় গৌড় হতে নিয়োজিত কানুনগ (দেওয়ান) গণ কর্তৃক সিলেট শাসিত হতো।

মোঘল শাসনামল

দিল্লীর মোঘল সম্রাট বাবরের পরে তার পুত্র হুমায়ুন সম্রাট হওয়ার পর হুমায়ুন ও শের শাহের বিগ্রহ কালে (১৫৩৭ সালে ) বাংলার দেওয়ান ও কিছু কিছু জমিদারবর্গ স্বাধীনতা লাভে বিদ্রোহ গড়ে ছিল । এ সময় খোয়াজ ওসমান নামক এক বিদ্রোহী ইটা ও তরফ রাজ্য অধিকার করে। তখনকার সময়ে শ্রীহট্টের গৌড়রের শাসন কর্তা ইউসুফ খাঁ’র সাথে বিদ্রোহ খোয়াজ ওসমানের যুদ্ধ হয় । অপরদিকে মোঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শের শাহ দিল্লীর সম্রাট হন । সিলেটের শাসনকর্তা ইউসুফ খা’র ভ্রাতা লোদি খাঁ সম্রাট শের শাহের দরবারে দিল্লীতে উপস্থিত হয়ে সিলেটের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা বর্নণা করলে, শের শাহ লোদী খাঁকে বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত করে বাংলার নাজিম ইসলাম খাঁ’র সহযোগিতার জন্য সেখানে প্রেরণ করেন । পরবর্তিতে নাজিম ইসলাম খাঁ’র সেনাপতি সুজাত খাঁ’র সেনা বাহিনীর কাছে খোয়াজ ওসমান পরাজিত হলে তরফ ও ইটা রাজ্য মোগলদের শাসনে আসে। বিদ্রোহ দমনের পর লদি খাঁ পুর্ণ ক্ষমতার সাথে সিলেটে মোগল শাসন পুণ্য প্রতিষ্টা করেন। লোদি খাঁ’র মৃত্যুর পর তার পুত্র জাহান খাঁ সিলেটের শাসন প্রাপ্ত হন। জাহান খাঁ সময় দিল্লীর শাসকদের মধ্যে ও পরিবর্তন সংঘটিত হয়ে পর্যায়ক্রমে সম্রাট আকবর দিল্লীর সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। সম্রাট আকবরের সময় কানুনগোদের (দেওয়ান) ক্ষমতা হ্রাস করা হয় [২][১৪] সম্রাট আকবরের সময়ে সুবে বাংলা ১৯ টি সরকার ঘটন করা হলে সিলেট একটি সরকার রুপে গন্য হয়। সম্রাট আকবরের রাজস্ব বিভাগের মন্ত্রী রাজা তডরমাল সিলেটকে ৮টি মহালে বিভক্ত করে প্রতি মহালের রাজস্ব নির্ধারিত করেন। প্রাচীন তাম্রমুদ্রা অনুযায়ী সিলেটের এক একটি মহালের রাজস্ব নিম্নরুপঃ-

মহালের নাম রাজস্ব মন্তব্য
প্রতাপগর ৩৭০,০০
বাণিয়াচং ১,৬৭২,০৮০
বাজুয়া ৮০৪,০৮০
জয়ন্তীয়া ২৭,২০০
হাবিলি (সিলেট শহর) ২,২৯০,৭১৭
সতের খণ্ডল ৩৯০,৪৭২
লাউড় ২৪৬,২০২
হরিনগর ১০১,৮৫৭

সিলেট বিভাগ হতে সম্রাট আকবরের মুদ্রানুসারে সর্ব মোট ১৬৭০৪০ টাকা রাজস্ব আদায় করা হত।[২] এছাড়া সিলেট হতে বিভিন্ন ফলমূল, বৃক্ষ ও পশু-পক্ষী বিক্রয় করে আয়কর বৃদ্ধি করে দিল্লীর মোঘল দরবারে পাঠানো হত বলে আইন-এ আকবরী গ্রন্থে বরাতে শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে। দিল্লী হতে নিযুক্ত আমিল বা ফৌজদারগণ রাজস্ব বিষয়ে ঢাকার নবাবের অধিনে এবং শাসন বিষয়ে মুর্শিবাদের অধিনে কাজ করতেন। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ রাজস্বের পাকা হিসাব প্রস্তত করেন। এতে সরকার সিলেট ও এর নিকটস্থ এলাকা নিয়ে চাকলা শিলহাট (তত্কালের রেকড পত্রে উচ্চারণ) ঘটিত হয় । তত্কালে সুবে বাংলার ১৩ চাকলার মধ্যে শিলহাট দ্বাদশ স্থানীয় গণ্য ছিল । ত্রিপুরা রাজ্যের সরাইল (বর্তমান ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া জেলার উপজেলা) ও ময়মনসিংহ জেলার জোয়ানশাহী প্রভৃতি প্রসিদ্ধ পরগণা চাকলা শিলহাটের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং রাজস্ব বর্ধিত করে ১৬৭০৪০ থেকে ৫৩১,৪৫৫ টাকা নির্ধারণে শ্রীহ্ট্টকে ৮ মহাল হতে ১৪৮ মহালে বিভক্ত করা হয়। মহাল গুলো পর্বতিতে ভিন্ন ভিন্ন পরগণায় খ্যাত হয়।[২] পরবর্তিতে সুজা উদ্দীনের সময় বাংলা ২৫ টি জমিদারীতে বিভক্ত হলে সিলেটকে ২১ নং স্থানে রাখা হয়। এ সময় বিবিধ ভিন্ন ভিন্ন নামে জায়গীর ভুমি বাদে শ্রীহট্টের খালসা ভুমি ৩৬ টি পরগণাভুক্ত ছিল।

ব্রিটিশ আমল

ষোড়শ শতাব্দিতে ভারত ও পুর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যের উদ্দেশে একদল ব্রিটিশ বণিক একটি জয়েন্ট‌-স্টক কোম্পানি গঠন করে। উক্ত কোম্পানির সরকারি নাম “ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি“। এ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংলান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ কোম্পানিকে ভারতে বাণিজ্যের জন্য রাজকীয় সনদ প্রদান করেন। এ সনদের ভিত্তিতে উক্ত কোম্পানি ২১ বছর পর্যন্ত ভারতের পুর্বাঞ্চলে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার লাভ করেছিল। উক্ত কোম্পানি ভারতের গুজরাট রাজ্যের সুরাট শহরে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে প্রথম বাণিজ্য কুঠির স্থাপনের অনুমতি পায়। পরে তারা হুগলি সহ ভারতের অন্যান্য শহরে কুঠির স্থান করে । সপ্তদশ শতাব্দীতে (১৬৫৮ সালে) কোম্পানির প্রতিনিধি জেমস হার্ট ঢাকা শহরে অনুপ্রবেশ করলে তার মধ্য দিয়ে বাংলায় ব্রিটিশদের আগমন শুরু হয় । ১৭১৫ সালে মোঘল দরবার হতে অনুমতি পেয়ে কোম্পানির নিজেস্ব ব্রিটিশ মুদ্রার প্রচলন শুরু করে। ১৭৩২ সালে মির্জা মোহাম্মদ আলী (আলীবর্দী খাঁ) ওড়িশা, রাজমহল ও বিহারের ফৌজদার ও সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খানের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে করেন। এ সালে সম্রাট মুহাম্মদ শাহ কর্তৃক বিহারকে বাংলার সুবাদের অন্তর্ভুক্ত করেন । এ সময় পর্যন্ত সিলেট মুঘলদের নিযুক্ত নবাবগণ দ্বারা শাসিত হতো । মুর্শিদাবদের ইতিহাস গ্রন্থের বরাতে অচ্যুতচরণ চৌধুরী লিখেন; সিলেটে নিযুক্ত (১৮ নং) নাবাব শমশের খাঁ’র অধীনে সীমান্ত প্রদেশ রক্ষায় আরোও ৪ জন নায়েব সিলেটের ফৌজদারীতে কাজ করতেন। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে গিরিয়ার যুন্ধ সংঘটিত হলে শমশের খাঁ সরফরজ খাঁ’র পক্ষে সসৈন্যে উক্ত যুদ্ধে অংশ নেন এবং সরফরজ খাঁ’র সাথে তিনিও সেখানে নিহ্ত হন। এদিকে মির্জা মোহাম্মদ আলী (আলীবর্দী খাঁ) জয়োল্লাসে বঙ্গের মসনদে অধিষ্ঠিত হন। তাহার আমলে সিলেট কাছার জয়ন্তীয়া প্রভৃতি অঞ্চল মুঘলদের নিযুক্ত নবাবগণ কর্তৃক শাসিত হতো । ১৭৫১ সালে (২৯ নং) নবাব নজীব আলী খাঁ নবাবী পদ প্রাপ্ত হয়ে সিলেটের শাসন পরিচালনায় নিযুক্ত হন । তাহার আমলে সিলেটের পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি লোক কর্তৃক নানাহ উত্পাত সংঘটিত হয় । পাহাড়ি লোকদের উত্পাত বন্ধ করতে সীমান্ত রক্ষাকারী নতুন নায়েব ফৌজদার মিরাট হতে আগমন করেন এবং মোসলমান ও খ্রিস্টান গোলান্দাজ সৈন্য বুন্দাশীল নামক স্থানে অবস্থান করেন। পাহাড়িদের আক্রমন টেকাতে সিলেটের বদরপুরে এক বৃহত্ত দুর্গ প্রস্তত করা হয়েছিল। যা আজও বদরপুরের কেল্লা হিসেবে পরিচিত হচ্ছে । পরবর্তিকালে ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল বাংলার স্বাধীন নবাব শাহ কুলি খান মির্জা মোহাম্মদ হায়বৎ জং বাহাদুর (সিরাজউদ্দৌলা) বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হন, তখন (৩০ নং) নবাব শাহ মতজঙ্গ নোয়াজিস মোহাম্মদ খাঁ সিলেট নবাবি পদ প্রাপ্ত হন। ১৭৫৭ সালে মীর জাফর আলী খাঁ, রায়দুর্লভ ও জগতশেঠ গং দের চক্রান্তে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলা বঙ্গের নদীয়া জেলার আম বাগানে ইংরেজদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত হন। সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতার সুর্য অস্তমিত হয়। সিরাজ উদ্দৌলার পতনের পর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর বাঙ্গাল সুবাদার হিসেবে স্বীকৃত হয়। পরবর্তিকালে তার উপর ইংরেজরা অসন্তুষ্ট হয়ে মীর কাসেমকে স্থলবর্তি করে। উল্লেখ যে, সিলেট সুলতানী আমল থেকে চুণা ব্যবসায় প্রসিদ্ধ ছিল । মীর কাসেমের আমলে ইংরেজরা সিলেট অনুপ্রবেশ করে এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুণা ব্যবসা করার জন্য মীর কাসেম কে দিয়ে সন্ধি করে । ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ২৭ সেপ্টেম্বর মীর কাসেমের সাপক্ষে সিলেটে চুণা সরবরাহের সন্ধি করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন চুণা সরবরাহের অজুহাতে সিলেটের মানুষের উপর অমানবিক উৎপিড়ন চালাতে থাকে । মীর কাসেম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকদের অত্যাচার নির্যাতন থেকে সিলেট সহ বাংলার মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। ইংরেজরা মীর কাসেমকে তাদের বিপক্ষে দেখে মীর জাফরকে বাংলার মসনদে পুনস্থাপন করে ১৭৬৩ সালের ১০ ই জুলাই সিলেটের চুণা ব্যবসা ব্যপ্তি জন্য ৫ ম দফায় নতুন সন্ধি পত্র প্রণয়ন করে । এই সন্ধি পত্র মোতাবেক ইংরেজরা চুণার আয়করের অর্ধেক মালিক হইয়া পড়ে এবং অপরার্ধেক সরকারের ব্যবহারের জন্য রয়ে যায় । এ বাভেই মীর জাফরের সহযোগিতায় একটি একটি করে দেশীয় রাজ্য ইংরেজদের দখলে আসে। ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা বঙ্গ বিহার ও উড়িষার দেওয়ানী লাভ করায় সিলেটও তাদের দখল আসে । এ সময় (জয়ন্তীয়া ও লাউড় রাজ্য ব্যতিত) সিলেটের নবাবদের অধিকৃত ভূভাগের পরিমাণ ছিল ২৮৬১ বর্গমাইল । ইংরেজ কোম্পানী ২৮৬১ বর্গমাইল ভূভাগের শুধু মাত্র রাজস্ব আদায়ে নিযুক্ত ছিল। শাসন ভার বা ফৌজদারী ক্ষমতা তখন নবাবগণের হাতেই ন্যস্ত ছিল [২] ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হিস্টিংস ভারতে ২৫০ টি মত জেলা সৃষ্টি করেন । তখন সিলেটকেও জেলায় রুপান্তর করা হয়। পূর্ব বঙ্গের রাজস্ব সংগ্রহ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় কর্ম নির্বাহের জন্য ঢাকায় রেডিনিউ বোড প্রতিষ্ঠিত করা হয় । সেই বোড হতে মিষ্টার থেকার (Thecker) সর্বোচ্চ কর্মচারী রুপে সিলেটে প্রথম আগমন করেন । তখনকার সময় ইংরেজ কর্মচারী দিগকে রেসিডেন্ট উপাদিতে আখ্যায়িত করা হতো । থেকারের সময় জয়ন্তীয়ার রাজা ছত্রসিংহ সিলেটের বৃটিশ প্রজাদিগকে নিপিড়িত করতেন । যে কারণ থেকারের আদেশানুসারে মেজর হেনিকার কর্তৃক পরিচালিত বৃটিশ সৈন্য জয়ন্তীয়া জয়ে সমর্থ হয় । এ ভাবে জয়ন্তীয়া কাছার ইত্যাদি রাজ্য সমুহ বৃটিশ শাসনের আওতায় সিলেটের কালেক্টরীর অন্তর্ভূক্ত হলে সিলেটের ভূভাগের আয়তন ৩৮০০ বর্গমাইলে গিয়ে দাঁড়ায় ।[১][২] ১৭৮০ সালে থেকার চলে গেলে রবার্ট লিন্ডসে নামক এক ইংরেজ কাউন্সিলার সিলেটের কালেক্ট হয়ে আসেন। এখানে এসে নিন্ডসে সিলেটের সম্পদের প্রতি ধারণা লাভ হয়। তাই তিনি ব্যক্তিগত তবিল থেকে এখানে প্রচুর টাকা বিনোয়গ করে বিভিন্ন জাতীয় ব্যবসা যেমন, চুনাপাথর, লবন, হাতির চামরা, জাহাজ তৈরি ও বিক্রি ইত্যাদিতে আত্মনিয়োগ করেন। অফিসের সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সময়টুকু ব্যবসায় ব্যয় করে লিন্ডসে অগাধ অর্থ উপার্জন করেন। এ সময় সিলেটের লোক সংখ্যা ছিল ১ লাখ। আর রাজ্যস্য ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার। লিন্ডসে আত্মজীবনি গ্রন্থের বরাতে অচ্যুত চরণ চৌধুরী সহ অনেক ঐতিহাসিকগণ লিখেনঃ এ প্রদেশের দায়িত্ব লাভ ও বেশি দিন থাকার জন্য লিন্ডসে ইংরেজ কোম্পানির উর্ধতম কর্ম-কর্তাদেরকে বহু উত্কুচ দিয়েছেন এবং এখানের রাজস্ব বিষয়ে কোম্পানির কাছে তিনি তার নিজ তবিল থেকেও সময় মত রাজস্ব আদায় করে যোগ্যতা প্রমাণ করতেন । এভাবে তিনি প্রচুরটাকা উপার্জন করে লর্ড শ্রেণীতে উন্নিত হন। কিন্তু তিনি সিলেটবাসীর উন্নয়নের জন্যে সামান্যতম অবদান রাখেনি[১][২]। ১৭৮১ সালে সিলেটে প্রলয়ঙ্করী বন্যার পানি ৩০ ফুট উঁচু হয়েছিল বলে রবার্ট লিন্ডসে তার জীবনিতে উল্লেখ করেন। কিন্তু ইংরেজ কোম্পানি দুর্গত্য মানুষের রাক্ষার্তে কোন উদ্যোগ নেয়নি। লিন্ডসেও তার দায়দায়িত্ব অবলিলায় এড়িয়ে যান। এ সময় দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে কোম্পানির অবহেলায় সিলেটের হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। যার ফলে ইংরেজ শাসনকে মানুষ সহজ ভাবে মেনে নিইতে পারেনি । ভেতরে ভেতরে মানুষের মনে বিদ্রোহ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। ১৭৮৯ সালে লিণ্ডসে সিলেট থেকে চলে গেলে তার স্থানে জন উইলিস সিলেটের কালেক্ট নিযুক্ত হন । উইলিস সিলেট আসিয় প্রায় লক্ষ টাকা ব্যয়ে সিলেটের জেল নির্মান করেন । ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে জন উইলিস সমগ্র সিলেটের লোক সংখ্যা গণনা করে । তাতে সিলেটের অধিবাসী সংখ্যা ৪৯২৯৪৫ এ দাড়ায় । ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে কোম্পানির শাসন চলেছিল মূলত এবং মুখ্যত লাভজনক ব্যবসায়িক দৃষ্টি ও রীতিপদ্ধতিতেই। আর ইংরেজ আয়করের অর্ধেক মালিক হয়ে পড়ে এবং অপরার্ধেক সরকারের ব্যবহারের জন্য রয়ে যায় । দেশীয় অর্থনীতির স্বনির্ভর সত্তাকে পরনির্ভর করার কার্যক্রম শুরু হয়। বৃটিশ সরকার এক চার্টার অ্যাক্ট বলে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার বিলুপ্ত করে এবং দেশের শাসনভার কোম্পানির উপর ন্যস্ত করে। এতে নবাবগণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন । এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়। রাজস্ব আদায়ের সুবিদা জন্য সিলেটে ১০ টি কেন্দ্র বা কালেক্টরী বিভাগ স্থাপিত করা হয়। এ কেন্দ্র গুলোর মধ্যে উত্তর শ্রীহট্টে ছিল; পারকুল, তাজপুর ও জয়ন্তীয়াপুর এই তিনটি । করিমগঞ্জে; লাতু এবং দহ্মিণ শ্রীহট্টে; নয়াখালি, রাজনগর ও হিঙ্গাজিয়া । হবিগঞ্জেঃ নবীগঞ্জ, লস্করপুর ও শঙ্করপাশা এবং সুনামগঞ্জের কালেক্টরী বিভাগ ছিল রসুলগঞ্জ । তখন সিলেটে নবাবি আমলের নির্দিষ্ট ১৬৪ পরগণা ছিল । ১৭৯৩ সালে উইলিস সিলেট ত্যাগ করেন। জন উইলিস’র পর ১৭৯৪ সালে রেইট ও জর্জ ইংলিস নামক দুই ব্যক্তি মিলিত হয়ে বর্তমান ছাতক শহরে রেইট ইংলিস এণ্ড কোম্পানী নামে যৌথ কারবার স্থাপন করে চুনা ব্যবসা শুরু করে। এই কোম্পানীর অভ্যুদয়ের পুর্বে ছাতক একটি সামান্য গ্রাম ছিল। তত্পুর্বে একজন সন্ন্যাসী ভূমীতে একটি ছাতি পোথিয়া তার ছায়ায় বসে তপ করতেন। সন্যাসীকে কেন্দ্র করে লোক আগমন ঘটলে, ক্রমে এই স্থান ক্ষুদ্র হাটে পরিণত হয়। কালক্রমে ছত্রক বা ছাতক বাজার আখ্যা হয়েছে [২] । এই ছাতক বাজারকে কেন্দ্র করে ইংলিস এণ্ড কোম্পানী পূর্ণ উদ্যমে চুনার ব্যবসা চালিয়ে যায়। কোম্পানী চুক্তির করে লোকদের দিয়ে চুনা সংগ্রহ করে কলিকাতায় চালান করত। ১৭৯৭ সালে জন অমুটি নামের কালেক্টর সিলেট আসেন। অমুটির সময় সিলেটে ইট দিয়ে তিন কোঠা বিশিষ্ট এক দালান তৈরি করেন। এ দালানে যতাক্রমে এক কোঠায় সরকারী কাজপত্র সংরক্ষন করা হত, অন্য কোঠায় কর্মচারিদের অফিস ও আরেকটিতে ছিল বিচারালয়। ১৭৯৮ সালের প্রারম্ভে বিভিন্ন প্র্যোজনিয় বস্তুর দাম বৃদ্ধি হলে উত্কৃষ্ট চালের মণ বার আনায় দাড়ায়। এমনি অবস্থায় ১৮০০ সালে সিলেট শহরে বসানো গৃহ কর । একদিকে দ্রাব্যাদির মুল্যবৃদ্ধি এর মধ্যে গৃহ কর বসানোর কারণ মানুষে কষ্ট বেড়ে যায়। ১৮০৩ সালে অমুটি বিদায় হলেন অস্থায়ী কালেক্টরদের আগমনের কারণ সিলেটবাসীর অভাব-অভিযোগের অগ্রগতি থেমে যায়। ১৮০৭ – ১২ সালে অনেক নতুন আবাদি ভূমী বন্দোবস্ত দেয়া হয় । এ বন্দোবস্তই ‘তালুক’ হালাবাদি মুমাদি ইত্যাদি নামে অভহিত হয়। ১৮১১ সালে গৃহ কর নিয়ে নানা ভাবে উত্পিড়িত হন সিলেটের মানুষ । এসময় বর্তমান বন্দর বাজারের নিকট দুপুড়ি হাওয়রে উত্তর পশ্চিমে বিস্তৃত রাস্তার পাশের কিছু সংখক দোকান-পাট ছিল। গৃহ করের চাপের কারণ অনেক গুলো দোকান-পাট বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান বন্দর বাজার অনেকাংশেই জলাভুমীতে পরিণত ছিল। পরে এ স্থানে মাটি ফেলে ভরাট করা হলে পুর্বে উল্লেখিত দুপুরি হাওয়র হতে বর্তমান বাজার পর্যন্ত দোকান স্থাপন করা হয়। যা বর্তমানে বন্দর বাজারে পরিণত হয় [২] । ১৮২৪ সালে আসাম সম্পুর্ণ ভাবে ইংরেজদের দখলে আসে। এসময় জয়ন্তীয়ার মধ্যদিয়ে আসামে যাত্রা পথ ছিল । কিন্তু ব্রহ্ম যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন আসামে যাতায়ত সুবিদার জন্য পাণ্ডুয়া চেরাপুঞ্জি হয়ে শিলং পর্যন্ত নতুন রাস্তা প্রস্তুয় করা হয় ।

স্বাধীনতা আন্দোলন

ইংরেজদের অত্যাচার নিপিড়নে অতিষ্ট কিছু সংখক মুসলমান নেতৃবৃন্দের চেষ্টায় ১৭৮২ সালের মহররম মাসে মুসলমানদের ধর্মীয় উত্সবের দিনকে কেন্দ্র করে ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহের প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়। কিন্তু ইংরেজ অনুরক্ত কয়েকজন লোক লিন্ডসের কাছে এ গোপন পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেয়। যার ফলে লিন্ডসে পরিস্তিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। এদিকে মুসলমানরা ধর্মীয় কাজ সম্পূর্ণ করে যখন বিদ্রোহের ঘোষণা করেন, সাথে সাথে ইংরেজরা ঝাপিয়ে পড়ে বিদ্রোহিদের উপর। ইংরেজ বাহিনীর হাতে পিস্তল আর বন্দুক, মুসলমান বিদ্রোহিদের হাতে তলোয়ার । এদিনের লড়াই প্রচণ্ড রুপ ধারণ করলো এতে ইংরেজদের গুলিতে শহীদ হলেন সৈয়দ হাদিসৈয়দ মাদি সহ আরো অনেক। সিলেটের এ বিদ্রোহকে ভারতে ইংরেজ বিরোধী প্রথম বিদ্রোহ বলে ঐতিহাসিক তাজুল মোহাম্মদ সহ আরো অনেকে লিখেছেন।[১][২][১৫]

১৭৮১ ও ১৭৮৪ সালে পরপর দুটি বিষম বন্যায় সমৃদ্ধপূর্ণ সিলেট ভূমী দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়। একদিকে ইংরেজদের লুটরাজ ও উল্লেখিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ বিষম অন্য অভাব দেখা দেয়। সিলেটের তদানিন্তন কালেক্টর লিন্ডসে তার আত্মজীবনিতে লিখেছেন; উল্লেখিত করাল দুর্ভিক্ষ হতে মুক্তি পেতে এ অঞ্চল হতে যে ধান বিক্রয়ের জন্য কলিকাতায় পাঠানো হয়েছিল, তা পুনরায়ন করিতে নৌকা পাঠিয়ে ছিলেন। তাতে কিয়দাংশ ধানই আনতে পেড়েছেন। ইংরেজ দুশ্যাসন ও দুর্যোগে পতিত সিলেটবাসী ধীরে ধীরে ক্ষুব্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরোদ্ধে বিদ্রোহে ঘোষণা করে। ১৭৮২ তে সংঘটিত হয় খাসিয়া বিদ্রোহ, ১৭৮৬ সালে চরগোল্লায় বিদ্রোহ, ১৭৯০ সালে জমিদারদের সাথে বিদ্রোহ । উল্লেখ্য যে, তাজুল মোহাম্মদ সহ অনেক ঐতিহাসিকদের মতে উভয় বাংলার ফকির সন্ন্যাসী সংঘটিত হয়ে ১৭৬৩ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুচনা করছিলো, তারই ধারাবাহিকতায় জনশক্তি বাড়ানোর নিমিত্তে অলিদের মাজার সহ বিভিন্ন মন্দির ও আখরায় ফকির সন্ন্যাসীরা দল বেঁধে ঘুরা-ফেরা করতেন। তারা বিশেষ ধরণের পোশাক পরিধান করতেন এবং হাতে লাঠি ও ত্রিশুল বহন করতেন । ব্রিটিশ কোম্পানীর শাসকরা ফকির সন্ন্যাসীদের এধরণের চলা-ফেরা সংন্দেহের চোখে দেখত। তাই ১৭৭৩ সালের ২১ জানুয়ারী ভারতের বড়লাট ওয়ারেন্ট হেষ্টিংস ফকির সন্ন্যাসীর লাঠি ত্রিশুলসহ ভ্রমন এবং চাঁদা ও বিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যার ফলে ফকির সন্ন্যাসীরা একপর্যায়ে বিদ্রোহে মেতেউঠেন। অনেক হতাহতির পর ১৮০০ সালের দিগে ভারত বর্ষের ঐতিহাসিক ফকির সন্ন্যাসীর এ আন্দোলন প্রায় স্তিমিত হয়ে আসে। তখন সিলেটে আগা মোহাম্মদ বেগের নেতৃত্বে ফকির সন্যাসীরা উত্তপ্ত হয়ে উঠেন। মোহাম্মদ বেগ ১৭৯৯ সালে কাছার হতে ১২’শ ফকির সন্যাসীসৈন্য সহ সিলেটে প্রবেশ করেন। সাথে সাথে এখানকার জমিন্দারগণ তাকে সমর্থন জানিয়ে ইংরেজকে খাজানা প্রদান বন্ধ করে দেন । ফলশ্রুতিতে ইংরেজরা বিন্দাশায় আগা মোহাম্মদের আস্তানা আক্রন করে প্রথমে পারাজিত হয় । পরবর্তিতে ব্রিটিশ ভারতের রাজকীয় বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হলে, ওদের সাথে যুদ্ধে আগা মোহাম্মদের বাহিনী পেরে ওঠেনি । ফলে প্রাণ দিতে হয় হাজারও সৈন্যকে। এদিকে আগা মোহাম্মদ বেগ উপায়ন্তর না দেখে ত্রিপুরার দিকে পালিয়ে যাওয়ার পথে ইংরেজদের হাতে বন্দি হন এবং ধরা পড়েন তার অনুসারী খাকীশাহ, রামপুর শাহ, নাজির শাহ ও রহিম শাহ সহ অনেক । ইংরেজরা আগা মোহাম্মদের বিচার ঢাকায় না করে কলিকাতায় নিয়ে যায় এবং যাবতজীবনের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।

১৭৮৬ সালে নভেম্বর মাসে প্রতাপগড়ের জমিদার রাধারাম ব্রিটিশ কোম্পানিকে রাজস্ব দিতে অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীন নবাব ঘোষনা করে চরগোল্লায় বিদ্রোহ করেন। রাধারামের কুকি সৈন্যবাহিনীর বিরোদ্ধে রবার্ট নিন্ডসে ডেভিডসনের নেতৃত্বে সৈন্য প্রেরিত হয় । খবর পেয়ে রাধরাম তার বাহিনী নিয়ে ঐতিহাসিক শন বিলের পাড়ে ঘাটি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলী শনবিল সম্পর্কে লিখেছেন; তখনকার সময়ে শনবিল ছিল অপ্রসর, সুর্দীঘ ও গভীর তরঙ্গসংকুল। এই শনবিল সম্পর্কে প্রবাদ ছিল, শনবিলে নড়ে চড়ে, রাতায় পরান মারে। শন বিলের উত্তরাংশকে রাতা বিল বলা হয়। ইংরেজ সৈন্যরা শন বিল দিয়ে রাধারামকে আক্রমন করার পরিকল্পনা করে এবং নৌকা যোগে সৈন্য বাহিনী নিয়ে শন বিল দিয়ে যাত্রা শুরু করে। ইংরেজরা গোলা-বারুদ ও কামান দিয়ে নৌকা থেকেই শন বিলের তীরে অবস্থানরত রাধারামের সৈন্যবাহিনীর উপর আক্রমন চালায়। একদিকে শন বিলের তরঙ্গময় স্রোত আর অন্যদিকে রাধারামবাহিনীর তীর-ধনুকের আঘাতে ইংরেজ বাহিনী আর তীরে ভিড়তে না পেরে প্রাণ হারায়। পরবর্তিতে ইংরেজরা রাধারামের বন্ধু কানুরামের সহযোগিতায় চরগোলার গোপন স্থল পথের সন্ধায় পেয়ে সে পথ ধরে আবার চরগোল্লায় আক্রমন করে রাধারামকে বন্দী করে এবং বাড়ি ঘর পুড়িয়ে ভস্ম করে চরগোল্লা জয় করে [১৫]

১৮২৬ সালে কুকিদের সরদার বুন্তাই’র নেতৃত্বে কুকিরা এবং ১৮২৭ সালে সিলেটের পাণ্ডুয়ায় খাসিয়ারা বিদ্রোহ করে । ১৮৫৭ সালে সিপাই বিদ্রোহ নামের ভারত ব্যাপি বিষম বিদ্রোহ ঘটিত হয়। এ বিদ্রোহের একটি স্ফুলিঙ্গ সিলেটে ইংরেজদের বিদগ্ধ করতে ধাবিত হলে সিলেটে সংঘটিত সিপাই যুদ্ধ। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে দেশীয় সৈন্য বাহিনী যখন বিদ্রোহ ঘোষনা কর, এ সময় চট্টগ্রামের ৩৩ নং সীমান্ত রক্ষী ও পদাতক বাহিনী চট্টগ্রামের অস্ত্রগার ও ট্রেজারী লুট করে এবং জেলখানার বন্ধি মুক্তি করে তারা পালিয়ে আসে সিলেটের দিকে। ত্রিপুরা পার হয়ে সিলেট প্রবেশ করলে সিলেটের মৌলভীবাজার অঞ্চলের পৃথিমপাশার জমিদার গউছ আলী খান তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে পাহাড়ি অঞ্চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে ইংরেজ প্রেরিত এক বিরাট বাহিনী বিদ্রোহী সিপাইদের গতিরোধ করতে প্রতাপগরের দিকে অগ্রসর হয় । চট্টগ্রাম হতে আগত সৈন্য সহ তিনশ’র ও বেশী স্বদেশী বাহিনী ইংরেজদের মোকাবেলা করতে বড়লেখা থানার পাশে লাতু নামক স্থানে অবস্থান নেয় এবং এ লাতু অঞ্চলে বিদ্রোহী সিপাইদের সাথে ইংরেজ বাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধ হয় । তখন বিদ্রোহী সিপাইদের গুলিতে ইংরেজ সেনাপতি মিষ্টার বিং সহ আরো অনেক ইংরেজ সৈন্য নিহত হয় । এ যুদ্ধ ৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল । শহীদ হন অনেক দেশীয় সিপাই । অবশেষে ইংরেজ বাহিনী সুবেদার অযোধ্যা নামক যোদ্ধার রণ কৌশলে বিদ্রোহী সিপাইদের অনেক জন আহত হলে বাকিরা পালয়ন করেন । এরপর ইংরেজরা বিভিন্ন স্থানে ধাওয়া করে পলাতক সিপাইদের নিহত ও বন্দি করে সিপাই বিদ্রোহ দমন করে।

১৮৭৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আসাম প্রদেশ গঠিত হয়। তখন আসামের ব্যয়ের তুলনায় আয় ছিল নগণ্য। স্থায়ী প্রশাসন পরিচালনায় শিক্ষিত লোকও অভাব ছিল । সিলেট জেলায় লোক বসতি অপেক্ষাকৃত ঘন ছিল। এখানকার লোক শিক্ষাদীক্ষায়ও অগ্রসর ছিল। সিলেটের নিম্নাঞ্চলে ধান ফসলে ভাণ্ডার ছিল । এছাড়া এ অঞ্চলে কয়লা, পাথর ও চুনা প্রভৃতি হতে আয় ছিল প্রচুর । তাই সিলেটের লোকবল ও সম্পদের আয়কে কাজে লাগিয়ে আসামকে উন্নত করতে এ জেলাকে আসামের সাথে সংযুক্ত করতে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা জারি করে। সিলেট বাংলার অংশ, তাই সিলেটবাসী বাংলার সাথেই থাকতে চায়। তাই তারা সরকারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন । প্রশাসন সিলেটবাসীর তিব্র প্রতিবাদে সিলেটকে আসামের সাথে সংযুক্ত করতে ব্যর্থ হয় । তখন ব্রিটিশ ভারতের বড় লাট নর্থব্রুক সিলেটে আসেন । সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বড় লাটের সাথে সাক্ষাত করে আসামে যুক্ত করার প্রতিবাদলিপি পেশ করেন। বড় লাট নর্থব্রুক সিলেটে ডিপুটি প্রশাসন সৃষ্টি করে সিলেটের উন্নয়ন গতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে নতুন প্রস্তাবের ভিত্তিতে সিলেটকে আসামে যুক্ত করেন। [১][২][১৫]

বঙ্গভঙ্গ ও রাজনৈতিক আন্দোলন

১৮৮৫ সালে থিওজোফিক্যাল সোসাইটির কিছু সদস্য কংগ্রেস প্রতিষ্টিত করলে গণ-আন্দোলনের শুরু হয়। এ সময় সিলেট অঞ্চল থেকে বিপিন চন্দ্র পাল বোম্বের কংগ্রেসে যোগদান করতঃ আন্দোলনে সিলেটবাসীর পক্ষে অবদান রাখেন। ১৯০৫ সালে ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গ (ভারতীয় বঙ্গ) অঞ্চলটিকে পূর্ববঙ্গ থেকে পৃথক করা হয়। হিন্দুরা পশ্চিম বঙ্গ ও মুসলমানরা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পশ্চিম বঙ্গ হতে ব্যাপক গণ-আন্দোলন শুরু হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব্বঙ্গের মুসলমানরা বিভাগিয় শাসন প্রতিষ্টার আশায় যখন ঢাকায় নতুন নতুন অট্টালিকা যেমন, বিচার বিভাগ, হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েট ও আইন পরিষদ প্রভৃতি নির্মাণে উজ্জীবিত, তখনই এর বিরুদ্ধে প্রশ্চিম বঙ্গ হতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। জাতীয়তাবাদি হিন্দু নেতৃবৃন্দ একে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অনৈক্য এবং মাতৃভূমী বিভক্তিকরণ ইত্যাদি আখ্যায়িত করে তিব্র আন্দোলন আরম্ভ করেন। ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং সিলেটকে আবার আসামে সংযুক্ত করা হয়। বঙ্গভঙ্গের পর থেকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ সম্মেলিত ভাবে যখন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরেন [১৬]। এ সময় সিলেটবাসীও রাজনীতির সাথে আরও ঘনিষ্ট হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। বিভিন্ন সময়ে সিলেটের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খেলাফত আন্দোলন, কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে সিলটবাসীর পক্ষে অবদান রাখেন। সিলেট শহরে বিভিন্ন সময় অনুষ্টিত হয়েছে রাজনৈতিক সম্মিলন। বালাগঞ্জের আরঙ্গপুর গ্রামে ১৯১৮ সালে অনুষ্টিত উলামা সম্মেলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন মৌলানা আব্দুল হক চৌধুরী, সৈয়দ আফরুজ বখত। ১৯২০ সালে ২২ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও খেলাফত সম্মিলন অনুষ্টিত হয় ভারতের নাগপুরে । সিলেট থেকে মুসলিমলীগের প্রতিনিধি মৌলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী অনেকজন সহকর্মি নিয়ে উক্ত সম্মিলনে অংশগ্রহন করে ছিলেন। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদমুহাম্মদ আলী জিন্নাহ খেলাফত কমিটির আমন্ত্রনে সিলেটের শাহী ঈদগাহ মাঠে অনুষ্টিত সমাবেশে যোগ দিয়েছেন । ১৯৩২ সালে সুরমাভ্যালি কৃষক সম্মিলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন শাহ ইসমাইল আলী। ১৯২১ সালে দু-দিন ব্যাপি মৌলভীবাজারে অনুষ্টিত হয় ভারতীয় খেলাফত সম্মিলন। এ সম্মিলনে ভারত খেলাফত আনন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভারত হতে আসেন প্রখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ মৌলানা হুসেন আহমদ মদনী ও সরোজিনী নাইডু। সমাবেশের আয়োজক ও অভ্যর্থনা কমিটির প্রথম কাতারের নেতৃবৃন্দ ছিলেন; মৌলানা নাজির উদ্দীন, মৌলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী, ডঃ মুর্তজা চৌধুরী, মৌলানা আব্দুল্লা বি, এল ও সৈয়দ আব্দুস সালাম। ১৯২৭ সালে সিলেটের বর্তমান শারদা হলে অনুষ্টিত হয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন সম্মিলন। এ সম্মিলনের অথিতিবৃন্দ ছিলেন বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও বেগম যুবেদা খাতুন চৌধুরী। এভাবে সিলেটবাসীর উত্সাহে আমন্ত্রীত হয়ে বিভিন্ন সময় ভারতে ব্রিটিশ বিরুধী আন্দোলনের প্রথম কাতারের নেতৃবৃন্দ সিলেট এসেছেন এবং সিলেটবাসীকে আন্দোলের জন্য উত্সাহিত করেছেন। ১৯৩৬ সালে সিলেটের সুনামগঞ্জে সংঘটিত হয় কৃষক আন্দোলন। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সর্বগ্রাসী সংগ্রামে ফলে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সালে বাংলাসহ বিভিন্ন প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্টিত হয় । হিন্দু প্রধান প্রদেশ গুলোতে কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠন করে । ১৯৩৭ সালে জিন্নাহ ঘোষণা করেন ভারতবর্ষে জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্টা করতে মুসলিমলীগ সবিশেষ আগ্রহী। রাজনৈতিক পটভূমিকায় লৌঙ্হ্মনতে মুসলিমলীগের অধিবেশন হলে, এতে শেরে বাংলা ফজলুল হক উত্তাপিত ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহিত হয় । লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে দুটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেন। মহাত্মা গান্ধী সহ জাতীয়াবাদি দল কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ এর বিরোধিতা করেন। ১৯৪২ সালে কংগ্রেস ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলন ভারত ছাড়ো (Quit India) সুচনা করে। সাথে সাথে বাংলা ও পাকিস্তানে আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠে । এতে ব্রিটিশরা বাধ্য হয়ে ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সে সাথে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুপ ধারণ করে । ভারত জুরে উক্ত সম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হলেও সিলেট অঞ্চল তখনঅও শান্ত ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়[১][২][১৫]

পাকিস্তানে অর্ন্তভুক্তি

অবেশেষে ইংরেজ বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠল। ইংরেজ বিদায়ের পর্বে ভারতকে বিভক্ত করার পরিকল্পনায় পাকিস্তান সহ দুই বাংলাকে দিখণ্ডিত করা উদ্যোগ নেয়। সিলেট তখন আসাম প্রদেশের একটি জেলা থাকা সত্তেও মুসলিম প্রধান জেলা ছিল। তাই সিলেট ভারতের না পাকিস্তানে থাকবে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠে। ১৯৪৬ সালে ২৩ শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সিলেটে আসেন । বিরাট জনসভায় মুসলমানদেরকে পাকিস্তানের পক্ষে সিন্ধান্ত গ্রহনে উত্সাহিত করে বক্তব্য রাখেন। ১৯৪৭ সালে ৩ জুন ইংরেজরা ভারত বিভক্তির ঘোষণা দেয় । ঘোষণা অনুযায়ী সিলেট মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পুর্ব্ বঙ্গের সাথে যোগ দেবে কি না তা নিয়ে গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয় । শুরু হয় কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের নেতৃবৃন্দের গণ সংযোগ। একদিকে কংগ্রেস নেতা বসন্ত কুমার দাস, বৈদ্যনাথ মুখার্জী, ব্রজেন্দ্র নারয়ণ চৌধুরী প্রমুখ সিলেটকে আসামের সাথে রাখার জন্য প্রাণপণ প্রচারণা চালান। অন্যদিকে নুরুল আমিন,হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন, তমিজ উদ্দীন, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, দেওয়ান আব্দুল বাছিত, ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, জিল্লুর রহমান সহ আরো অনেক নেতৃবৃন্দ সিলেটে এসে সিলেটকে পুর্ব বঙ্গ (বাংলাদেশ) এর সাথে রাখার জন্য প্রচারণা চালাতে থাকেন । অবশেষে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই মাসে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় । গণভোটে কমিশনার নিযুক্ত আসামের লিগেল রিমমব্রেসার এইচ এ ষ্টর্ক এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়ীত্ব নেন ডিপুটি কমিশনার ড্রামব্রেক। সিলেটের জনগণ নির্বাচনে ৫২ হাজার ৭ শ’ ৮০ ভোটে পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয় । [১][১৫]। কিন্ত রেডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী করিমগঞ্জ মহকুমার পাথারকান্দি, রাতাবাড়ি ও বদরপুর থানা এবং করিমগঞ্জ থানার অধিকাংশ সিলেট থেকে বিচ্যুত হয়ে আসামভুক্ত হয়ে ভারতে সাথে চলে যায়।[১৭]

ভাষা আন্দোলন

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয় এবং ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। এ বিভক্তির সময় বাংলার মুসলিমপ্রধান পূর্ব ভাগ পুর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় ও হিন্দু প্রধান পশ্চিম ভাগ পশ্চিমবঙ্গ নামে ভারতে চলে যায়। পাকিস্তান নামে দেশটি সৃষ্টি হওয়ার পর, তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বৈষম্য অব্যাহ্ত থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। ভৌগোলিক, সংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল রাজনৈতিক দন্দ্ব। পাকিস্তান সৃষ্টি হলে প্রথমেই আঘাত করা হয় পূর্ব বাংলার ভাষার উপর । রাষ্ট্রের গৃহীত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৬ কোটি ৯০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলাভাষী এবং উর্দু সহ আরো অন্যান্য ৭টিরও বেশী ভাষায় কথা বলতো ২ কোটি ৫০ লক্ষ। অর্থাৎ জনসংখার শতকরা ৬৪ ভাগ ছিল বাংলাভাষী আর শতকরা ৩৬ ভাগ লোক অন্যান্য ভাষায় কথা বলতো। তবুও পাকিস্তানের শাসকগোষ্টি শুধু বাঙালীদের দাবিয়ে রাখার জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সম-মর্যাদার দাবীতে শুরু হয় আন্দোলন। বাঙালী জাতীয়তাবাদি নেতৃবৃন্দ পাকিস্তান গণপরিষদে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঢাকায়, কলকাতায় সর্বস্থানে বাংলাভাষার দাবি উত্থাপন করে, শাসক গোষ্টির রাষ্ট্রভাষা উর্দু’র প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। পত্র পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেন, আব্দুল হক, মাহবুব জামাল জাহেদী, ফররূখ আহমদ, ডঃ কাজী মোতাহের, আবুল মনসুর, আবুল কাশেম ও ড এনামুল হক সহ আরো অনেকে । আর ঐ সময় বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় সব চেয়ে বেশী লিখা বের হয় ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর। বাংলাদেশের ভেতর থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা’ করার দাবি নিয়ে ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে প্রথম লিখা বের হয় সিলেটের আল ইসলাহ পত্রিকায়। প্রবন্ধ লিখেন মুসলিম চৌধুরী। এ লিখার সূত্র ধরে ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে প্রকাশ্যে জনসভা অনুষ্টিত হয়েছিল সিলেটে । এ পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্য কোথায় বাংলা ভাষার দাবিতে কোন সভা হয়েছে বলে আর শোনা যায়নি। পরবর্তিতে ১৯৪৮ সালে ৮ মার্চে সিলেটের গোবিন্দ পার্কে সভা অনুষ্টিত হলে এতে বিঘ্নতা ঘটায় পাকিস্তান পন্থী মুসলিম লীগের সন্ত্রাসবাদি নেতারা। ১০ মার্চে সিলেটের মহীলা মুসলীম লীগ প্রতিবাদ সভার ডাক দেয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তা হতে দেয়নি। তারা সিলেট শহরে দুই মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। প্রতিবাদের ফেটে পড়ে সিলেটবাসী। দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে সারা জেলায়। ধারাবাহিক আন্দোলন হয় হবিগঞ্জে, মৌলভীবাজারসুনামগঞ্জে। ১৯৫০ সালের কোন একসময় অসম্প্রাদায়ীক ছাত্র সংগঠন গড়ার লক্ষে সিলেটের রসময় মেমোরিয়েল হাইস্কুলে এক সমাবেশ আহবান করে সংগঠন গড়ার প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির আহবায়ক চেয়ারম্যান মনোনিত হন অধ্যাপক আসদ্দর আলী, আহবায়ক সদস্য বাংলাদেশের বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও তারা মিয়া প্রমুখ। এ কমিটি গড়ার কিছু দিন পরেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটে এক সরকারী সফরে এলে, তিনি এধরণের সংগঠনের জন্ম রোধ করতে স্থানীয় প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দিয়ে যায়। যার ফলে জেলা প্রশাসক ১৩ নভেম্বর থেকে সিলেটের সদর থানা এলাকায় দুই মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। এমনকি সংগঠনের উদ্যোক্তাদের উপরও ১৪৪ ধারা প্রয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়। তবুও সাবেক জেলা প্রশাসক তা দাবিয়ে রাখতে পারেননি। ১৯৫১ সালে আসদ্দর আলী, তারা মিয়া, এ এম আব্দুল মুহিত, নাসির উদ্দীন আহমদ চৌধুরী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় ১৬ নভেম্বর গোলাপগঞ্জের মৌরপুর পরগণাধীন পাঠানটুলা মাঠে জমায়েত হন সিলেটের ছাত্র নেতারা। সম্মিলনের কাজ শেষ হবার পুর্বেই ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিরাট পুলিশবাহিনী নিয়ে সম্মিলেন স্থলে উপস্থিত হয়ে সম্মিলন মাঠে ১৪৪ ধারা জারি করেণ। তখন নেতৃবৃন্দ কৌশলগত ভাবে উপস্থিত সমাবেশকারী সকলের প্রতি নামাজ আদায়ের আহবান জানান। একজন দাড়িয়ে আজান দিলেন। সকলেই অজু করে এসে জামাতবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করেন। নামজের ইমামতি করছিলেন মাওলানা শামসুল হক। তিনি নামাজ শেষে এক দীর্ঘ মোনাজাত করতে গিয়ে সমাবেশের উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করে বলেন; হে আল্লাহ আজকের এই সমাবেশে গঠিত সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন নামে সংগঠনকে তুমি কবুল কর। সংগঠনের মনোনিত সভাপতি আব্দুল হাই ও খন্দকার রুহুল কুদ্দুসকে সাধারণ সম্পাদক, এভাবে নেতাদের নাম ও পদবি উল্লেখ করা হয়। পুলিশের ১৪৪ ধারার মধ্য দিয়ে মোনাজাতে সর্ব বিষয় ব্যক্ত করে সংগঠনের জন্ম হয়েছে বলে ঐ দিনের মোনাজাতকে ঐতিহাসিক মোনাজাত বলে সিলেটে অভিহিত করা হয়। পরবর্তিতে এ সংগঠনের নেতারাই ঢাকা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংগঠনগুলোর সাথে যোগসাজশ রেখে বাংলাভাষার দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির অনেক আগে থেকে সিলেট শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালে আন্দোলন শুরু হলে সাথে সাথে সিলেট শহরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শহর জনস্রোতে পরিণত হয়। বিক্ষুব্ধ সিলেটবাসী ২১শে ফেব্রুয়ারি হতে ১৫ দিন সিলেটে ধর্মঘটের ডাক দেয়। এভাবেই সিলেটবাসী ভাষা আন্দোলনে ভুমীকা রাখেন।[১][১৫]

প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর বিবরণ

খাসিয়া – খাসিয়ারা খাসিয়া ও জয়ন্তীয়া পাহাড়ে বসবাস করত । ওরা কয়লা জাতীয় দ্রব্যের বিক্রেতা ছিল । বহু কাল পরে এদের অনেকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহন করেছে।

Manipuri dance,Ras Lila
তিপরা – ওরা ছিল বোদো জাতীয় হিন্দু । তিপরাগণ বাঙ্গালী সংস্রব পেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে । পরবর্তিকালে মণিপুরিদের আচার ব্যবহার অনুসরণ করে তাদের ন্যায় বেশভূষা ধারণ করতে যত্নবান হয়েছে।
মণিপুরী – মণিপুরীগণ শ্রীহট্টের ঔপনিবেশিক জাতি। মণিপুরীরা অর্জ্জুন পুত্র বভ্রুবাহনকে তাদের আদিপুরুষ বলিয়া ক্ষত্রিয়ত্বের দাবি করে ও উপবীত ধারণ করে। শ্রীহট্ট সদর, পাথারকান্দি, জাফরগড়ের লক্ষিপুর, শিলং, লংলা, ধামাই, তরফ, আসামপারা, সুনামগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে ওদের বসবাস। বহ্মযুদ্ধের পরই মণিপুরিরা শ্রীহট্ট ও কাছাড়ে আগমন করে উপনিবেশ স্থাপন করে। মণিপুরীদের আলাদা এক কথ্য ভাষা আছে।
লালং – প্রাচীনকালে ওরা কাছাড়ের ডিমাপুর নামক অঞ্চলে বসবাস করতো। কথিত আছে; তথাকার রাজা মানবদুগ্ধ পান করতেন এবং ওদের (লালংগণ) দৈনিক ছয়সের দুধ যুগান দিতে হতো। রোজ ছয়সের দুধ যুগান অসাধ্য ভেবে, রাজার ভয়ে পালায়ন করে জয়ন্তীয়ায় এসে বসবাস করে । পরবর্তিকালে পাহাড়ি অঞ্চল পরিত্যাগ করে শ্রীহট্টের সমতল ক্ষেত্রে এসে বসবাস শুরু করে। সামাজিক দিক দিয়ে ওরা বিবাহউত্তর স্ত্রী’র বংশভুক্ত হয় এবং স্ত্রী’র মরণউত্তর নিজ বংশে গণ্য হয়।

উক্ত পার্বত্য জাতি ছাড়া শ্রীহট্ট জেলায় আরও বহু জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। যাদের মধ্যে; কামার, কুমার, কায়স্থ, কুশিয়ারী, কেওয়ালী, কৈবর্ত্ত, নমশ্রুদ্র, গণক, গাড়ওয়াল, গন্ধবণিক, গোয়াল, জেলে, চুণার, ঢোলি, তাতি, তেলী, দাস, ধোপা, নদীয়াল, নাপিত, ব্রাহ্মণ, বর্ণ-বাহ্মণ, ময়রা, যুগী, বারুই, বৈদ্য ইত্যাদি । এদের মধ্যে পার্বত্য সম্প্রদায় ব্যতিত সকলই বাঙ্গালী জাতি। খ্রিস্টীয় সহস্রাব্দের পরবর্তিকালে শ্রীহট্টে মোসলমান জাতিগোষ্ঠী আগমন ঘটে। মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ, কোরায়েশ, শেখ, মোগল বংশীয় বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। মুসলমানদের মধ্যে সাধারণ মুসলমান সহ প্রায় ৯৫ শতাংশ সুন্নী মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং বাকি ৫ শতাংশ শিয়া বা অন্যান্য মাতাদর্শের লোক বলে জানা যায়[২][১৮]

প্রাচীন বাণিজ্য বিবরণ

সিলেটের ইতিহাস গ্রন্থ সমুহের উদ্ধৃতি মতে; গ্রীকদূত মেগাস্থিনিস ও খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের টলেমির নৌবাণিজ্য নির্দেশিকা বিবরণীতে আছে কিরাদিয়া (পরর্বতিতে কিরাত হতে ত্রিপুরা আখ্যা প্রাপ্ত) দেশের সীমান্তে একটি মেলা বসতো। আর এতে আমদানি হতো শ্রীহট্টের তেজপাতা ও দ্রাক্ষাপত্রের ন্যায় পাটি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ চৌধুরী উক্ত মেলায় আমদানি কৃত পাটিকে শ্রীহট্টের প্রসিদ্ধ শীতল পাটি বলেছেন।[২][১৯][২০] ঐতিহাসিক আলোচনায় বিভিন্ন দিক থেকে জানা যায় যে, শ্রীহট্ট প্রাচীন কাল থেকেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল। প্রাচীন রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ে বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে বলা হয়, বিভাগীয় এই শহরটি প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্ব দুয়ারে বা দরবারে সুপরিচিত। এ বিষয়ে ইতিহাস গবেষক ও সাংবাদিক মতিয়ার রহরমান চৌধুরী’র রচিত বিলেতে সিলেটবাসী” গ্রন্থে এবং ‘সিলেট বিভাগের ইতিবৃত্তে’ এই অঞ্চলে বিভিন্ন নৌ-ঘাটির থাকার উল্লেখ পাওয়া যায। যার মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার অধীন রাজনগর থানার ইন্দেশ্বরের নৌ-ঘাটি ও হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংগের আজমিরিগঞ্জ ও ইনায়েতগঞ্জের প্রাচীন বাণিজ্যিক নৌ-ঘাটিসমুহ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্বনিধি “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে” কাষ্ঠ শিল্প বিষয়ক অধ্যায়ে” লিখেছেন; শ্রীহট্টের ‘কাঠ শিল্প’ প্রাচীনকাল থেকেই বিখ্যাত। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের কাঠ দ্বারা শ্রীহট্টের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যের জাহাজ ও যুদ্ধের জন্য জাহাজ তৈরীর বিবরণ বিভন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে লিখিত আছে। এই অঞ্চলে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তাম্রফলকে উদ্ধৃতি সহ বালা হয়, কামরুপ অধিপতি রাজা ঈশান দেবে এই অঞ্চলে সমর তরী (যুদ্ধ জাহাজ) তৈরি করতেন। মোগলদের রাজত্বকালে লাউড় অধিপতিরা মোগল সম্রাটদেরকে যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করে দিতেন। পরবর্তী সময়ে (ইংরেজ শাসনামলে) মিঃ লিণ্ডস্ যখন এই অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন তখন প্রায় একাদশ সহস্র মণবাহী এক জাহাজ মিঃ লিণ্ডস নিজের জন্য তৈরি করান।[২১],[২২],[২] এছাড়া সিলেট বিভাগে প্রাচীন কালে আগর কাট দ্বারা আতর তৈরি হতো। হ্যান্টের স্টাটিস্টিকেল একাউন্ট বলা হয়, সিলটের আগর কাটের আতর আরব ও তুর্কিতে রপ্তানি হতো এবং ইহা ভারত বিখ্যাত আতরে গণ্য ছিল। সিলেটের ছাতক হতে চুণা পাথর, দু-আলীয়া পাহাড়ের লবণ, জয়ন্তীয়া ও লংলা পাহাড়ের কয়লা, এবং মালনী ছড়া, ইন্দেশ্বর ও কালীনগর প্রভৃতি চা বাগান হতে রপ্তানি যোগ্য চা উত্পন্ন হয়। যা প্রাচীন কাল হতে অদ্যবদি দেশী-বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে বাজার জাত করা হচ্ছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।[২][২২][২৩]